Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০০:২৯, ২৭ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০০:৩১, ২৭ মার্চ ২০২৬

২৫ মার্চের গণহত্যা: নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ও ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন

২৫ মার্চের গণহত্যা: নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ও ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন
ছবি: সবার দেশ

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৫ মার্চ এক বিভীষিকাময় রাত। ১৯৭১ সালের এ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘Operation Searchlight’ নামক পরিকল্পিত অভিযান চালিয়ে নিরস্ত্র পুর্ব পাকিস্তানের জনগনের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্তব্য করেছেন—এ গণহত্যা ছিলো সুপরিকল্পিত এবং এটি প্রতিরোধ করা না যাওয়ার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা আজও ইতিহাসের গবেষণার বিষয়। 

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য নতুন নয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে—কেনো এ বিপর্যয় ঠেকানো গেলো না, এবং তৎকালীন নেতৃত্বের কোথায় সীমাবদ্ধতা ছিলো?

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, ২৫ মার্চের গণহত্যা আকস্মিক ছিলো না; বরং এটি ছিলো দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পরিণতি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ অঞ্চলের অবিসংবাদিত নেতা। তার নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন কার্যত পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এ পরিস্থিতিতে সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছিলো? বিশেষ করে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারণ করার পর স্বাধীনতা যুদ্ধের কোনও আগাম প্রস্তুতি নেয়া হয়নি কেনো? কেনো সংলাপের নামে কাল ক্ষেপন করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ব্যপক সংখ্যক সৈন্য ও যুদ্ধ সরঞ্জাম পূর্ব পাকিস্তানে আনার সুযোগ করে দেয়া হলো?

ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে শেখ মুজিব, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কৌশলগত মনোভাব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন। ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় একটি রাজনৈতিক সমাধানের আশা তিনি শেষ পর্যন্ত ছাড়েননি। কেনোনা শেখ মুজিবের একমাত্র আকাঙ্খাই ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হওয়া; বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়। তার এ আদর্শিক আশাবাদ একদিকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ হলেও, অন্যদিকে এটি ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের জনপদের জন্য এক ধরনের ঝুঁকি, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

২৫ মার্চের আগের দিনগুলোতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনা সমাবেশ, অস্ত্র মজুদ, এবং বিভিন্ন গোপন প্রস্তুতির খবর ছড়িয়ে পড়ছিলো। তবুও কেন্দ্রীয়ভাবে জনগণকে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত করার দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। এমনকি স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা প্রতিরোধ যুদ্ধের স্পষ্ট নির্দেশও সে মুহূর্তে অনুপস্থিত ছিলো। সমালোচকদের মতে, এ দ্বিধা ও দেরি পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রথম আঘাত হানার সুযোগ করে দেয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি তখন বাস্তবিকই সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখতো? রেসকোর্সে যা বলা হয়েছে তা কি ‘বাত কি বাত’ শুধুই হুমকি, না-কি বিশ্বাস থেকেই বলা? অনেক গবেষক বলেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তখন আবেগে উদ্বেল হলেও সামরিক দিক থেকে সংগঠিত ছিলো না। পাকিস্তানি বাহিনীর তুলনায় তারা ছিলো অপ্রস্তুত। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, যদি আগেভাগে একটি প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি করা যেতো, তাহলে হয়তো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো।

আরও পড়ুন <<>> ত্রয়োদশ সংসদ: গণতন্ত্রের মঞ্চে জুলাই চেতনার পরীক্ষা

শেখ মুজিবের নেতৃত্বের আরেকটি সমালোচিত দিক হলো তার গ্রেফতার হওয়া। ২৫ মার্চ রাতেই তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। প্রশ্ন উঠেছে—তিনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মগোপন না করে গ্রেফতার হয়েছিলেন, না-কি এটি ছিলো একটি কৌশলগত ভুল? তার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়, যা প্রথম দিকে দিশেহারা জাতির প্রতিরোধকে কিছুটা বিঘ্নিত করে। যদিও তৎকালীন মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণায় সেনাবাহনীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণও স্বাধীনতা সংগামে সম্পৃক্ত হয়। পরে যদিও প্রবাসী সরকার গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়, তবুও শুরুতে একটি কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অভাব ছিলো স্পষ্ট।

তবে এ সমালোচনার পাশাপাশি বাস্তবতার আরেকটি দিকও বিবেচনা করা জরুরি। শেখ মুজিব ছিলেন একজন রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কৌশলবিদ নন। তার মূল লক্ষ্য ছিলো গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন এবং একটি রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা। তার রেসকোর্সের ভাষণ ছিলো শুধুমাত্র পলিটিক্যাল নেগোশিয়েশনের কৌশলগত অস্ত্র। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুরতা এবং তাদের পরিকল্পনার গভীরতা হয়তো অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিলো। সে প্রেক্ষাপটে তার সিদ্ধান্তগুলোকে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা কিছুটা সরলীকরণও হতে পারে।

তবুও ইতিহাস কঠিন প্রশ্ন তোলে। কেনো জনগণকে আগে থেকেই প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত করা হলো না? কেন আন্তর্জাতিক মহলে আরও জোরালো কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা গেলো না? কেনো সামরিক আক্রমণের সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়নি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি।

২৫ মার্চের গণহত্যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত কখনও কখনও জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে। শেখ মুজিবের অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অনস্বীকার্য—তিনি বাঙালির জাতিসত্তার প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে তার নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতাও আলোচনার ঊর্ধ্বে নয়। একটি পরিপূর্ণ ইতিহাস গঠনের জন্য প্রশংসা ও সমালোচনা—দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, ২৫ মার্চের গণহত্যা প্রতিরোধ করা না যাওয়ার পেছনে একক কোনও কারণ নেই। এটি ছিলো শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভ, রাজনৈতিক ভুল হিসাব, সামরিক অপ্রস্তুতি, এবং প্রতিপক্ষের নির্মম কৌশলের সম্মিলিত ফল। আজকের প্রজন্মের জন্য এ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যাতে ভবিষ্যতে কোনও জাতি এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় আর না পড়ে।

ইতিহাসের এ অধ্যায় এখনও গবেষণার জন্য উন্মুক্ত। নতুন তথ্য, নতুন বিশ্লেষণ হয়তো আমাদের আরও পরিষ্কার ধারণা দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—২৫ মার্চের সে রাত আমাদের শুধু শোকের নয়, আত্মসমালোচনারও দিন।

২৭ মার্চ ২০২৬
সম্পাদক

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:

১৮ বছর পর স্বাধীনতা দিবসে কুচকাওয়াজ উপভোগ সাধারণের
ধামইরহাটে যথাযথ মর্যাদায় মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন
সৌদিতে স্ট্রোক করে বাংলাদেশির মৃত্যু
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের সমাধিসৌধে বিজিবি‘র পুষ্পস্তবক অর্পন
গফরগাঁওয়ে বালু উত্তোলনকে ঘিরে ছাত্রদল-গ্রামবাসীর সংঘর্ষ
কুমিল্লায় বাসচাপায় একই পরিবারের ৪ জনসহ নিহত ৫
২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার অফার করেছিল ‘ডিপ স্টেট’: আসিফ মাহমুদ
যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে ইরানের ‘১০ লাখ যোদ্ধা’ প্রস্তুত
গণরায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া কোনও শক্তিই টিকতে পারেনি
বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে আর্জেন্টিনার ক্যাম্পে যোগ দিলেন মেসি
সাবেক ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদ ৫ দিনের রিমান্ডে
গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলে সুপারিশ, জামায়াতের আপত্তি
পদ্মায় বাসডুবি: ২৬ লাশ উদ্ধার, অভিযান সাময়িক স্থগিত
হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশসহ ৬ দেশের জাহাজে নিরাপত্তা দেবে ইরান
হাদি হত্যা মামলার আসামি ফেরাতে ভারতকে চিঠি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ইমরান খান জেলে মরলেও নীতি থেকে সরবেন না-ছেলেদের ভাষ্য