ত্রয়োদশ সংসদ: গণতন্ত্রের মঞ্চে জুলাই চেতনার পরীক্ষা
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মধ্য দিয়ে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এ অধিবেশন ছিলো অনেক দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ছিলো সংসদীয় রীতিনীতি মেনে কার্যক্রম শুরু, অন্যদিকে ছিলো রাজনৈতিক প্রতীক, প্রতিবাদ এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রার নানা বার্তা।
অধিবেশনের শুরুতেই একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায়। স্পিকারের চেয়ার শূন্য রেখেই প্রথম বৈঠক শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান প্রথম বৈঠকের সভাপতিত্বের জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসনের সংসদ সদস্য ড. খন্দকারের নাম প্রস্তাব করেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সে প্রস্তাব সমর্থন করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবটির প্রতি সমর্থন আসে। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের যে ভাষায় সংসদের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদকে সম্মান জানিয়েছেন, তা উপস্থিত সংসদ সদস্য, দেশি-বিদেশি অতিথি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের দৃষ্টি কাড়ে।
রাজনীতির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি সমর্থন করা এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সৌজন্যমণ্ডিত বক্তব্য সংসদের পরিবেশে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। এতে স্পষ্ট হয়—সংসদ যদি চায়, তবে রাজনৈতিক ভিন্নতা রেখেও পারস্পরিক সম্মান ও সৌজন্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিভাজন এবং সংঘাতের ইতিহাস পেরিয়ে একটি নতুন সংসদ যখন শুরু হয়, তখন পারস্পরিক সম্মান ও সৌজন্য গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
প্রথম দিনের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিলো সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ। সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের নেতারা একযোগে তার রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম—সবাই গণতন্ত্রের সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
আলোচনার এ মুহূর্তটি ছিলো বিরল। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর অবদানকে সম্মান করার সংস্কৃতি খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু প্রথম দিনের অধিবেশন দেখিয়েছে—জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যের একটি নৈতিক ভিত্তি এখনও বিদ্যমান।
রাজনীতিতে মতভেদ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমালোচনা, বিতর্ক এবং মতপার্থক্য গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। তবে কিছু কিছু বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্যও জরুরি। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে সে ঐক্যই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। প্রথম দিনের অধিবেশনে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সে সম্ভাবনার আভাস পাওয়া গেছে।
শোক প্রস্তাবে শহীদ ওসমান হাদি, শহীদ আবরার ফাহাদ এবং সীমান্তে নিহত ফেলানীর নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তরুণ প্রজন্মের অনুভূতিকে সংসদের আলোচনায় তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা জাতীয় মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সংসদকে একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে দেখতে চান।
তবে সংসদের প্রথম দিনই যে কেবল ঐকমত্যের ছবি ছিলো তা নয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের প্রতিবাদ এবং ওয়াকআউট নতুন সংসদের রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। কেউ কেউ এ প্রতিবাদকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করলেও সংসদীয় গণতন্ত্রে ওয়াকআউট একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক ভাষা। এটি বিরোধী দলের অসন্তোষ প্রকাশের সাংবিধানিক পদ্ধতি।
বরং প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—এ বিরোধ কি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহৃত হবে, নাকি কেবল রাজনৈতিক অবস্থান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?
আরও পড়ুন <<>> প্রতিবিপ্লবের ছায়া! পরিবর্তনের পথে সতর্কতা
এ সংসদের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। সে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণ একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—স্বৈরাচার, জবাবদিহিহীন ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের রাজনীতি তারা আর মেনে নেবে না। এখন সে প্রত্যাশার বোঝা এসে পড়েছে সংসদের ওপর। এখন চ্যালেঞ্জ হলো—সে চেতনাকে রাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় কাঠামোর ভেতরে কীভাবে রূপ দেয়া যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়, তবে তাকে কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চ হয়ে থাকলে চলবে না। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ অতীতে দেখেছে ক্ষমতার অহংকার কীভাবে গণরোষের সামনে ভেঙে পড়তে পারে। ইতিহাস সাক্ষী—জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোনও রাজনৈতিক কাঠামো স্থায়ী হয়নি। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিন তাই কেবল একটি শুরু। এ শুরুতে যেমন ঐক্যের আভাস আছে, তেমনি রয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিতও।
কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে একটি প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এ সংসদ কি সত্যিই জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে? যদি পারে, তবে এ সংসদই হতে পারে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের ভিত্তি। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাস আবারও তার কঠোর বিচার করবে।
১৩ মার্চ ২০২৬
সম্পাদক




























