Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০৬:২১, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রতীকি সংযম নয়, জবাবদিহিই হোক শিরোনাম

প্রতীকি সংযম নয়, জবাবদিহিই হোক শিরোনাম
ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে প্রতীকের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতায় আসার পর শাসকরা প্রায়ই সরলতা, সংযম বা সাধারণ জীবনযাপনের বার্তা দিতে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর সাইকেলে চড়ে অফিসে যাওয়া শুরু করেছিলেন—একটি দৃশ্য যা সে সময়ের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।  

সামরিক শাসনের কঠিন বাস্তবতা, গণতান্ত্রিক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রশ্নগুলোকে ছাপিয়ে সে সাইকেল হয়ে ওঠে শিরোনাম, কিন্তু শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক ঘাটতি, ক্ষমতা দখলের বৈধতা, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নগুলো তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়।

এটি ছিলো এক ধরনের মিডিয়া-ফ্রেমিং—যেখানে প্রতীক বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়। অথচ তার শাসনামলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উপজেলা ব্যবস্থা চালু, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা পদক্ষেপ ছিলো, যেগুলো নিয়ে গভীর নীতিগত বিতর্ক হতে পারতো। সমালোচনা ও প্রশংসা—দুই-ই হতে পারতো তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে ব্যক্তিগত সরলতার প্রদর্শনী।

বর্তমান প্রেক্ষাপটেও আমরা একই প্রবণতা লক্ষ করছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের দশ দিনের মাথায় ব্যক্তিগত চলাচলে সরলতা দেখিয়েছেন—ট্রাফিক বন্ধ না করে চলাফেরা, সীমিত গাড়িবহর, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জ্বালানি ব্যয় না নেয়ার ঘোষণা। নিঃসন্দেহে এগুলো ক্ষমতার চর্চায় সংযম এবং একটি সংস্কৃতিগত পরিবর্তনের ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে রাষ্ট্রনেতার নিরাপত্তা ও সময়ের মূল্য বিবেচনায় এর বাস্তবতা ও ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। 

কিন্তু এখানেই মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রনেতার সময় ও নিরাপত্তা জাতীয় সম্পদ। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সন্ত্রাসবাদের বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর চলাচল কতটা উন্মুক্ত হওয়া উচিত—এ প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত সংযমের প্রশংসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিরাপত্তা কাঠামো, প্রোটোকল সংস্কার এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা আরও বেশি জরুরি।

সংবাদমাধ্যমের কাজ কেবল প্রশংসা করা নয়; বরং এ প্রশ্ন তোলা—কীভাবে নিরাপত্তা ও দক্ষতা নিশ্চিত রেখে প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলানো যায়? ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে সম্ভব? রাষ্ট্রীয় সময় বাঁচাতে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স কতটা এগোচ্ছে? শুধু ‘হেঁটে গেলেন’ বা ‘ট্রাফিক বন্ধ করলেন না’—এ ধরনের শিরোনাম জনস্বার্থের পূর্ণ প্রতিফলন নয়।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা বৈঠকে কৃষকদের দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের ঘোষণা ছিলো একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ। কৃষিখাত বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ঋণমুক্তি স্বস্তি আনতে পারে, তবে এর আর্থিক প্রভাব, ব্যাংকিং খাতের স্থিতি ও ভবিষ্যৎ ঋণপ্রবাহের ওপর প্রভাব কী হবে—এসব প্রশ্নের বিশ্লেষণ জরুরি। 

একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তন—বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর–এর বিদায় ও নতুন গভর্নর নিয়োগ—আর্থিক নীতির ধারাবাহিকতা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে গভীর আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু এসব গুরুতর অর্থনৈতিক প্রশ্ন অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায় ব্যক্তিগত জীবনযাপনের খুঁটিনাটি খবরে।

আরও পড়ুন <<>> সূর্য উঠেছে, আলো কতদূর?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে প্রায়ই ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। কিন্তু স্তম্ভের কাজ কেবল সৌন্দর্য বাড়ানো নয়; স্থিতি রক্ষা করা। এ স্তম্ভের দায়িত্ব হলো—ক্ষমতার ওপর নজরদারি, জনস্বার্থ রক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মিডিয়া যদি রাষ্ট্রনেতার ওজুর সময়, খাবারের মেনু বা পারিবারিক উপস্থিতিকে প্রধান সংবাদ বানায়, তবে তা জনস্বার্থের চেয়ে কৌতূহল মেটায় বেশি। এর ফলে নীতিনির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দুর্নীতি প্রতিরোধ—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আলোচনার বাইরে থেকে যায়। মিডিয়া যদি শুধু ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করতে ব্যস্ত থাকে, তবে প্রতিষ্ঠান ও নীতির বিশ্লেষণ অনিবার্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখানে দুটি ভারসাম্য জরুরি। প্রথমত, প্রয়োজনীয় প্রশংসা—যেখানে নীতিগত বা প্রশাসনিক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে, তা স্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, গঠনমূলক সমালোচনা—যেখানে বিচ্যুতি বা ঝুঁকি আছে, তা তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরা। ব্যক্তিকেন্দ্রিক মহিমাকীর্তন যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না, তেমনি অন্ধ বিরোধিতাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মিডিয়ার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—তথ্যের গভীরতা বাড়ানো। শিরোনামের ঝলক নয়, নীতির প্রভাব বিশ্লেষণ; ব্যক্তির ছবি নয়, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা; আবেগ নয়, তথ্য—এ রূপান্তর জরুরি। কৃষিঋণ মওকুফের ঘোষণার মতো সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির ধারাবাহিকতা যাচাই, ট্রাফিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের রূপরেখা অনুসন্ধান—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানই পারে গণমাধ্যমকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করতে।

মিডিয়া সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, আবার প্রচারযন্ত্রও নয়। বরং এটি হতে পারে এক কার্যকর ‘ছায়া সরকার’—যে সরকারকে নীতি নির্ধারণে সহায়ক সমালোচনা দেয়, ভুল ধরিয়ে দেয়, এবং সাফল্যকে উৎসাহিত করে। প্রশংসা হোক প্রয়োজনীয়, সমালোচনা হোক গঠনমূলক—এভাবেই সংবাদমাধ্যম তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। তাহলেই গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হবে।

২৭ ফেব্রয়ারি ২০২৬
সম্পাদক

শীর্ষ সংবাদ:

পাকিস্তান-আফগান তীব্র সংঘাত, ১৩৩ আফগান সেনা নিহত
‘মব’ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
নূরাকে ২৪ ঘণ্টায় ধরার আলটিমেটাম হাসনাত আবদুল্লাহর
মাধবদীতে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ৪ আসামি গ্রেফতার
চার দশক পর আবারও বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশ
ইফতারে বিরতি নেই, মুসলিম সতীর্থদের জন্য ইনজুরির অভিনয় খ্রিষ্টান ফুটবলারের
এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১০দিন ব্যাপী কর্মসূচি
মার্কিন পোশাক বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান
টিউলিপকে গ্রেফতারে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ
বিজয়ী ৫ অদম্য নারী যাচ্ছেন বিভাগীয় লড়াইয়ে
থানায় ধর্ষণ চেষ্ঠা মামলা না নেয়ায় নারীর আত্নহত্যার চেষ্ঠা
সংবিধান সংস্কার পরিষদ না হলে সংসদ অচল হবে: নাহিদ
সেনাবাহিনীর শীর্ষ ছয় পদে রদবদল
অধ্যক্ষকে পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধনে বিএনপির বাধা
জামিন পেয়েই বাদীকে মারধর করলেন নোবেল
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার
দোকানে ঢুকলো তেলবাহী লরি: বাবার মৃত্যুর ছয়দিন পর ছেলের মৃত্যু
জয়নুল আবদীন ফারুকের স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন
পুলিশ-সোয়াট-ডগ স্কোয়াডের সমন্বয়ে মোহাম্মদপুরে অভিযান