Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০৪:১৮, ৬ মার্চ ২০২৬

প্রতিবিপ্লবের ছায়া! পরিবর্তনের পথে সতর্কতা

প্রতিবিপ্লবের ছায়া! পরিবর্তনের পথে সতর্কতা
ছবি: সবার দেশ

ইতিহাসের প্রতিটি বিপ্লবই মানুষের আশা ও স্বপ্নের প্রতীক। কিন্তু একই ইতিহাস আমাদের এটাও শেখায়—বিপ্লবের সাফল্য নির্ভর করে কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ওপর নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের চরিত্রগত পরিবর্তনের ওপর। ক্ষমতা বদলালেই যদি শাসনের সংস্কৃতি না বদলায়, তবে বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এ আন্দোলন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের দাবি ছিলো না; বরং ছিলো ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসানের প্রত্যাশা। মানুষের ক্ষোভের পেছনে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের বেদনা কাজ করেছিলো।

কিন্তু ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে—বিপ্লবের পরের সময়টাই সবচেয়ে সংবেদনশীল। বিপ্লব দৃশ্যমানভাবে আসে, কিন্তু প্রতিবিপ্লব অনেক সময় নীরবে ফিরে আসে। এটি ট্যাংক বা অস্ত্র নিয়ে নয়, বরং এটি প্রকাশ নীতির ভাষায়, প্রশাসনিক সিদ্ধানন্তে, নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা ক্ষমতার নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার ছদ্মবেশে। বাইরে গণতন্ত্রের কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলেও ভেতরে পুরোনো স্বার্থের পুনর্বিন্যাস ঘটতে পারে—এটাই সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে—জুলাই আন্দোলনের মূল নৈতিক দাবি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে? আন্দোলনের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিলো দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে যে সংস্কার প্রক্রিয়ার গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংক খাতের সংস্কার, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণখেলাপি ব্যবস্থার পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ দীর্ঘদিনের সমস্যা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, শক্তিশালী নজরদারি ছাড়া এ সংকট সমাধান কঠিন। যদি সংস্কার উদ্যোগগুলো কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জনগণের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবিপ্লবের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো ইতিহাসের ভাষা পরিবর্তন। কোনও আন্দোলনকে ‘স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা’, ‘অরাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা’ বা ‘মব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হলে তার নৈতিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্দোলনের ত্যাগকে ছোট করে দেখানো, নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং শহীদদের স্মৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা—এসবই রাজনৈতিক ইতিহাস বিকৃতির পরিচিত কৌশল। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—বিপ্লবকে দুর্বল করার অন্যতম পথ হলো তার নৈতিক শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, আন্দোলনের ত্যাগকে খাটো করে দেখানো এবং নতুন ইতিহাস নির্মাণের প্রচেষ্টাকে বিভ্রান্ত করা।

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আন্দোলন-সম্পর্কিত তথ্যের পাশাপাশি অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে নীরব প্রতিরোধ। কোনও সংস্কার উদ্যোগ প্রকাশ্যে সমর্থিত হলেও বাস্তবে ধীরগতি বা অদৃশ্য বাধার মুখে পড়লে সেটিও প্রতিবিপ্লবী প্রবণতার ইঙ্গিত হতে পারে। ইতিহাস বলে, ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর থেকে আসা নীরব অসহযোগিতা অনেক সময় সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধিতার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহিতা। নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি অংশ মাত্র, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির ওপর। যদি প্রশাসনিক নিয়োগ, অর্থনৈতিক নীতি বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব দেখা দেয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন <<>> প্রতীকী সংযম নয়, জবাবদিহিই হোক শিরোনাম

জুলাই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ভিত্তি ছিলো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কম থাকা উচিত। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও তা যদি রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতেও একটি বিষয় স্পষ্ট—ছোট অর্থনীতির দেশগুলো বড় শক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে চাপের মুখে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন শক্তির কৌশলগত স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একতরফা কূটনীতি যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি নীতিহীন ভারসাম্য রাজনীতিও রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না।

তরুণ সমাজের প্রত্যাশা এখন দ্রুত ফলপ্রসূ সংস্কার। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি খাত এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সামাজিক হতাশা বাড়তে পারে। বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দেয়া।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিপ্লবের চেয়ে কঠিন কাজ হলো বিপ্লবের অর্জন রক্ষা করা। ক্ষমতার কাঠামো বদলালেও যদি শাসন সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তবে পরিবর্তনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন রাষ্ট্র ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতার সংস্কৃতিকে স্থায়ী ভিত্তিতে দাঁড় করাতে পারবে।

বাংলাদেশ এখন একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে সংস্কারের প্রত্যাশা, অন্যদিকে রয়েছে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসের আশঙ্কা। এ অবস্থায় প্রয়োজন সমালোচনার স্বাধীনতা, নীতিনির্ভর রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।

প্রশ্ন রয়ে যায়—আমরা কি সত্যিকারের রূপান্তরের পথে হাঁটছি, নাকি পরিবর্তনের আবরণে পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার পুনরুত্থান দেখছি? ইতিহাসের শিক্ষা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যৎও বারবার অতীতকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

কারণ বিপ্লব একদিনে ঘটে, কিন্তু তার মূল্যবোধ রক্ষা করতে প্রয়োজন প্রজন্মের সতর্কতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ।

৬ মার্চ ২০২৬
সম্পাদক

শীর্ষ সংবাদ:

গ্যাস সংকটে আনোয়ারার দুই সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে চাকরির সুযোগ
ইরানের ড্রোন হামলায় দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্র
মাঝ আকাশে উধাও ভারতের যুদ্ধবিমান
বাগাতিপাড়ায় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্নসাৎতের আভিযোগ
যশোরে আন্তঃজেলা মোটরসাইকেল চোরচক্রের দুই সদস্য-আটক
যশোরে আবাসিক হোটেল থেকে ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার
যেভাবে খামেনিকে হত্যা করে ইসরায়েল
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আবারও ফাইনালে ভারত
হামলার পর জনশূন্য তেহরানের রাস্তা
আল আকসা মসজিদে জুমার নামাজে নিষেধাজ্ঞা দিলো ইসরায়েল
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে দায়িত্ব পালনে সরকার ব্যর্থ: নাহিদ
আইভী ও বদির জামিন স্থগিত
টঙ্গী বাজারের রাবেয়া মার্কেটে ভয়াবহ আগুন
মেট্রোরেলে সিট দখলের কৌশল ঠেকাতে মতিঝিল স্টেশনে নতুন নিয়ম
দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
বাগেরহাট-১ আসনে ভোট পুনর্গণনার নির্দেশ হাইকোর্টের