বিচার ঝুলে থাকলেই জন্ম নেয় নতুন রামিসা, নতুন তনু
ধর্ষণের পুনরাবৃত্তির পেছনে বিচারহীনতার কালো ছায়া
বাংলাদেশে ধর্ষণ যেনো আর বিচ্ছিন্ন কোনও অপরাধ নয়; এটি এখন সমাজের গভীরে প্রোথিত এক ভয়াবহ সংকট। প্রতিবার কোনও শিশু, কিশোরী বা নারী ধর্ষণের শিকার হলে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হয়, রাজপথে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, মানববন্ধন হয়, টকশো জমে ওঠে—কিন্তু কিছুদিন পরই সবকিছু থেমে যায়। থেমে যায় না শুধু বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আর সে বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়াতেই জন্ম নেয় নতুন নতুন তনু, আছিয়া, তানিয়া কিংবা রামিসা।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা—এ যেন সভ্যতার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত। রামিসার ঘটনায় মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। সড়ক অবরোধ হয়েছে, বিক্ষোভ হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ন্যায়বিচারের দাবিতে ঝড় উঠেছে। কিন্তু মানুষ আজ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে—এ ক্ষোভ কি শেষ পর্যন্ত আরেকটি ফাইলবন্দি মামলায় গিয়েই থামবে?
কারণ, এ দেশ আগেও তনুকে দেখেছে। ২০১৬ সালে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সোহাগী জাহান তনুর লাশ উদ্ধার হয়েছিলো। ধর্ষণের আলামত ছিলো স্পষ্ট, ছিলো নির্যাতনের চিহ্ন। দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন হয়েছিলো। কিন্তু আজও সে মামলার চূড়ান্ত বিচার হয়নি। বছরের পর বছর তদন্ত, ডিএনএ রিপোর্ট, নতুন করে তদন্ত—সবকিছুর ভেতরে হারিয়ে গেছে বিচার। তনুর মা এখনও কাঁদেন, কিন্তু রাষ্ট্রের আদালত এখনও কোনও নিশ্চিত উত্তর দিতে পারেনি—কারা হত্যা করেছিলো তনুকে?
একইভাবে আলোচিত তানিয়া ধর্ষণ মামলাও আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার এক প্রতীক। প্রতিটি ঘটনায় প্রথমদিকে প্রশাসনের কঠোর বক্তব্য শোনা যায়, দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেয়া হয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মামলার গতি কমে যায়। সাক্ষী অনুপস্থিত, তদন্তের ধীরগতি, প্রভাবশালীদের চাপ, রাজনৈতিক হিসাব—সব মিলিয়ে বিচার যেনো ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ করা হয়। আর এ দীর্ঘসূত্রিতাই অপরাধীদের কাছে এক ধরনের বার্তা পৌঁছে দেয়—‘শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না।’
আছিয়ার ঘটনাও একই বাস্তবতার অংশ। ধর্ষণের পর সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হলেও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থা খুব বেশি দেখা যায়নি। কারণ জনগণ জানে, এ দেশে অনেক আলোচিত মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কখনও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় না, কখনও তদন্ত শেষ হয় না, আবার কখনও রাজনৈতিক পালাবদলে মামলার গতিপথ বদলে যায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—ধর্ষকদের বড় অংশ মনে করে তারা পার পেয়ে যাবে। এ মানসিকতা রাতারাতি তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের দুর্বলতা, বিচারহীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সংস্কৃতি থেকে। যখন একজন কৃষক পাঁচ হাজার টাকার ঋণ শোধ করতে না পারলে জেলে যায়, অথচ ধর্ষক বছরের পর বছর জামিনে ঘুরে বেড়ায়, তখন সমাজে ভয় নয়—বরং অপরাধের সাহস তৈরি হয়।
আরও পড়ুন <<>> সংসদীয় বাক্যবিতর্কের ভেতরেও আশাবাদের খোঁজ
ধর্ষণের বিচার বিলম্বিত হওয়ার পেছনে আরও কিছু কাঠামোগত সংকট রয়েছে। পুলিশের তদন্তে গাফিলতি, আলামত সংরক্ষণে ব্যর্থতা, মেডিকেল রিপোর্টে বিলম্ব, আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেক পরিবারই শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের আশা ছেড়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, চরিত্রহনন করা হয়, এমনকি আপসের চাপও দেয়া হয়। ফলে বিচারব্যবস্থা ভুক্তভোগীর আশ্রয়স্থল না হয়ে উল্টো ভয়ের জায়গায় পরিণত হয়।
আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। বহু ঘটনায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনও না কোনও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়। আইন তখন সাধারণ মানুষের জন্য কঠোর, কিন্তু ক্ষমতাবানদের জন্য নমনীয় হয়ে পড়ে। এ দ্বৈত বাস্তবতা সমাজে ভয়াবহ বার্তা দেয়।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই ধর্ষণ বন্ধ করতে চায়, তাহলে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ বা বিবৃতি দিলেই হবে না। প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। প্রতিটি ধর্ষণ মামলার তদন্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করতে হবে। তদন্তে গাফিলতি করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়—অপরাধ দেখে বিচার করতে হবে।
কারণ বিচারহীনতা শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা নয়; এটি ভবিষ্যতের অপরাধকে আমন্ত্রণ জানানোর নাম। তনুর বিচার ঝুলে থাকলে রামিসা জন্ম নেয়। রামিসার বিচার বিলম্বিত হলে আবার কোথাও নতুন কোনও শিশুর আর্তনাদ শোনা যাবে।
এ রাষ্ট্রকে ঠিক করতে হবে—সে কি ধর্ষকের ভয় হবে, নাকি ভুক্তভোগীর দীর্ঘশ্বাসের রাষ্ট্র হয়েই থাকবে?
সম্পাদক
২২ মে ২০২৬




























