ন্যায়বিচার, প্রতিশোধ নাকি ইতিহাসের পুনর্লিখন
ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচার সময়ের দাবি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ শুধু একটি তারিখ নয়—এটি একটি যুগচিহ্ন, একটি গভীর ক্ষত, একটি অমীমাংসিত অন্ধকার অধ্যায়। ২০০৭ সালের সে ক্ষমতার পটপরিবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়—এটি ছিলো গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ওপর এক সুপরিকল্পিত আঘাত, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়া এক অদৃশ্য শক্তির প্রকাশ। প্রায় দুই দশক পর আবার যখন সে সময়ের কুশীলবদের নাম সামনে আসছে, তখন প্রশ্ন একটাই—এতদিন কেনো বিচার হয়নি, আর এখন কেনো নয়?
ওয়ান-ইলেভেনের মূল চরিত্রদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। তাদের নেতৃত্বে যে শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো, সেটি সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিলো—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে আলোচিত। আজ তারা কেউ দেশে নেই। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, অনেকটা জনসম্মুখের বাইরে। তাদের নীরবতা যেমন প্রশ্ন তৈরি করে, তেমনি রাষ্ট্রের নীরবতাও এতদিন ছিলো বিস্ময়কর।
ওই সময়ের কর্মকাণ্ড শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না; বরং রাষ্ট্রের ভেতরে একটি ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নির্বাসনে ঠেলে দেয়া, গণগ্রেফতার, নির্যাতন—এসবই ছিলো সে প্রকল্পের অংশ। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে উদ্দেশ্য ছিলো ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, যদিও বাহ্যিকভাবে একটি নিরপেক্ষ সরকারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিলো।
এ প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক ডিজিএফআই পরিচালক মো. আফজাল নাছের-এর গ্রেফতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনও আইনগত পদক্ষেপ নয়; বরং দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য অবস্থান।
বাস্তবতা হলো, এতদিন এ কুশীলবদের অধিকাংশই আইনের নাগালের বাইরে ছিলেন। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে, কেউ মধ্যপ্রাচ্যে, কেউবা ইউরোপে অবস্থান করে নির্বিঘ্ন জীবনযাপন করেছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও বিচার হয়নি। এটি শুধু আইনের শাসনের জন্য নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির জন্যও একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
এ প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ান-ইলেভেনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিলো, যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিলো, যে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে রাজনীতিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা হয়েছিলো—সেসব কি কেবল ইতিহাসের পাতায় চাপা পড়ে যাওয়ার জন্যই ছিলো?
আরও পড়ুন <<>> ২৫ মার্চের গণহত্যা: নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ও ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন
বাস্তবতা হলো, ২০০৯ সালে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ অধ্যায়ের পূর্ণাঙ্গ বিচার হয়নি। কিছু বিচ্ছিন্ন তদন্ত, কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য—কিন্তু কোনও সুসংগঠিত বিচার প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। ফলে অভিযুক্তরা ধীরে ধীরে দেশ ছেড়ে চলে যান। কেউ কূটনৈতিক দায়িত্বে, কেউ চিকিৎসার অজুহাতে, কেউবা সরাসরি আত্মগোপনে।
এ যেন এক ধরনের ‘ইমিউনিটি’—যেখানে ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা সময়ের সাথে সাথে দায়মুক্তি পেয়ে যান।
এখন সময় এসেছে সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার
বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া মানেই প্রতিশোধ নয়—বরং এটি রাষ্ট্রের আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া। যারা সংবিধান ও জনতার ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসতে চেয়েছিলো, যারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটি না করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
তবে এ বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং সর্বজনীন। শুধু কিছু ব্যক্তিকে টার্গেট করে নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। সে সময়ের প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, এমনকি কিছু মিডিয়া, আমলাতন্ত্র ও তথাকথিত সুশীল সমাজের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ ওয়ান-ইলেভেন ছিলো একটি সমন্বিত উদ্যোগ—যেখানে একাধিক পক্ষ সক্রিয় ছিলো। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাত্রাটিও উপেক্ষা করা যাবে না।
নির্বাসিত জীবন: দায় এড়ানোর কৌশল?
ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এর অধিকাংশ কুশীলব আজ দেশের বাইরে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে, কেউ দুবাইয়ে, কেউ কানাডায়। তারা কেবল ভৌগোলিকভাবে দূরে নন, আইনের আওতার বাইরেও অবস্থান করছেন।
এ বাস্তবতা একটি কঠিন প্রশ্ন উত্থাপন করে—রাষ্ট্র কি তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য কোনও কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে?
যদি না নিয়ে থাকে, তাহলে বর্তমান গ্রেফতার অভিযান কি শুধুই ‘লোকাল অ্যাকশন’? বড় খেলোয়াড়রা কি এখনও নিরাপদ?
এটি শুধু আইনি প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সদিচ্ছারও প্রশ্ন।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: ন্যায়বিচার নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নাম উল্লেখ করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসা স্বাভাবিক। কারণ ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি ছিলেন অন্যতম ভুক্তভোগী। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়াকে কোনও ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে যুক্ত না করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা জরুরি। অন্যথায় এটি রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে যাবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র বারবার পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সে পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো—অতীতের অন্যায়ের বিচার না হওয়া। ওয়ান-ইলেভেন সে ব্যর্থতার একটি বড় উদাহরণ। এবার যদি সে অধ্যায়ের বিচার শুরু হয়, তাহলে এটি হতে পারে একটি নতুন দৃষ্টান্ত।
এটি কেবল অতীতের হিসাব চুকানোর বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা—রাষ্ট্রের ওপর কোনও অদৃশ্য শক্তি নয়, জনগণের ইচ্ছাই চূড়ান্ত।
অতএব, ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচার শুধু সময়ের দাবি নয়—এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত। এখন প্রয়োজন এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকবদ্ধ সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সর্বোপরি একটি ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি।
রাষ্ট্র যদি এবারও ব্যর্থ হয়, তাহলে ইতিহাস নিজেকে আবারও পুনরাবৃত্তি করতে পারে। আর যদি সফল হয়, তাহলে এটি হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। রাষ্ট্রের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এ সূক্ষ্ম সীমারেখাটি রক্ষা করা।
সম্পাদক
৩ এপ্রিল ২০২৬




























