বিশ্ব চলচ্চিত্রের মিলনমেলা
জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে শুরু ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব
ফ্রান্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহর কান আবারও পরিণত হয়েছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রাণকেন্দ্রে। বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক, সমালোচক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের উপস্থিতিতে উৎসবের প্রথম দিনই ছিলো উৎসাহ-উচ্ছ্বাসে ভরপুর।
কান শহরের ঐতিহ্যবাহী ‘পালে দে ফেস্টিভ্যাল’ ভবনে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলো তারকাদের মিলনমেলা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে লাল গালিচা ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকারা একে একে অনুষ্ঠানে অংশ নিলে ক্যামেরার ঝলকানিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ফ্যাশন, গ্ল্যামার ও শিল্পচর্চার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায় এবারের আয়োজনে।
উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন চীনের খ্যাতিমান অভিনেত্রী গং লি ও হলিউড তারকা জেন ফন্ডা। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সূচনা ঘোষণা করেন। এ সময় জেন ফন্ডা বলেন, চলচ্চিত্র সবসময়ই প্রতিরোধের এক শক্তিশালী মাধ্যম, কারণ গল্পই একটি সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে। অন্যদিকে গং লি বলেন, সিনেমা ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রজন্মের সীমা অতিক্রম করে মানুষের আবেগকে একত্রিত করে।
আয়োজকরা উদ্বোধনী বক্তব্যে বিশ্ব চলচ্চিত্রে কান উৎসবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাদের মতে, চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বর্তমান বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ ও বিভাজনের সময়ে সিনেমা মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করা হয়।
এবারের আসরে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নিচ্ছে ২২টি চলচ্চিত্র। স্পেনের পেদ্রো আলমোদোভার, যুক্তরাষ্ট্রের জেমস গ্রে এবং রোমানিয়ার ক্রিস্টিয়ান মুঙ্গিউসহ বিশ্বের খ্যাতিমান নির্মাতাদের চলচ্চিত্র এবারের প্রতিযোগিতায় স্থান পেয়েছে। সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক সংকট, যুদ্ধ, প্রেম এবং সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোকে ঘিরে ইতোমধ্যেই দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে প্রদর্শিত হয় বিশেষ চলচ্চিত্র ‘ইলেকট্রিক ভেনাস’, যা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। পাশাপাশি প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নেয়া নির্মাতাদের পরিচয়ও তুলে ধরা হয়। আয়োজকরা জানান, বিশ্বের নানা ভাষা ও সংস্কৃতির চলচ্চিত্র নিয়ে এবারের উৎসব আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার সম্মানসূচক ‘পাম দ’অর’ প্রদান করা হয় নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত নির্মাতা পিটার জ্যাকসনকে। ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজির এ নির্মাতা সম্মাননা গ্রহণ করে বলেন, আমি কখনও ভাবিনি কান উৎসবে এ ধরনের স্বীকৃতি পাবো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন ফরাসি অভিনেত্রী আই হাইদারা। বক্তব্যে তিনি বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বাস্তবতার সংকট নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্কের বিষয়টিও।
এদিকে উৎসবের জুরি বোর্ডের সভাপতি দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা পার্ক চান-উক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিল্প ও রাজনীতিকে আলাদা করে দেখার কোনো কারণ নেই। তার এ মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
এবারের উৎসবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে। জুরি সদস্য ও হলিউড অভিনেত্রী ডেমি মুর বলেন, এআই এখন বাস্তবতা। এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়ে একে কীভাবে সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের পাশাপাশি এবার থাকছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, শিক্ষার্থী নির্মাতাদের বিভাগ এবং বিশেষ প্রদর্শনী। প্রতিদিন চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন, মতবিনিময় সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ফলে পুরো কান শহরজুড়েই এখন উৎসবের আবহ বিরাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কান চলচ্চিত্র উৎসব শুধু একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র আয়োজন নয়; এটি বিশ্ব সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্ম। এখান থেকেই প্রতিবছর নতুন নির্মাতা, নতুন ধারা এবং নতুন চলচ্চিত্র ভাবনার উত্থান ঘটে। তাই এবারের আসর নিয়েও প্রত্যাশা অনেক বেশি।
সব মিলিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্ব চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন আলোচনা এবং নতুন শিল্পভাবনার দুয়ার খুলে দেবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবার দেশ/কেএম




























