নিখোঁজের সাত মাস পর এক পা হারিয়ে ফিরলো রায়হান
দেশজুড়ে ভিক্ষাবৃত্তি চক্রের সিন্ডিকেট
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সাতঘর নোয়াপাড়ার অটোরিকশাচালক নাজিমউদ্দীনের ছেলে রায়হান। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে পড়তো সে। সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় শিশুটি। দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজির পর ছেলেকে ফিরে পেলেও তার একটি পা নেই। পরিবারের দাবি, নিখোঁজ থাকার সময় রায়হানকে একটি চক্র ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করেছিলো। তবে কীভাবে তার পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন রায়হানের বাবা নাজিমউদ্দীন তাকে চুল কাটার জন্য ১০০ টাকা দিয়েছিলেন। পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কক্সবাজারের দিকে রওনা হয় সে। ট্রেন স্টেশনে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাদের সঙ্গে ট্রেনে চড়ে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছায় রায়হান।
রায়হানের দেয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, ঢাকায় পরিচিত হওয়া কয়েকজনের সঙ্গে রাতে একটি বাড়িতে ঘুমাতে যায় সে। বাড়িটির দুই পাশে বাগান ছিলো বলে তার বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ঘুম থেকে উঠে নিজেকে একটি হাসপাতালে দেখতে পায় রায়হান। তখন তার একটি পা বিচ্ছিন্ন ছিলো।
কীভাবে পা হারিয়েছে, জানতে চাইলে সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা তাকে জানায়, ট্রেনে আসার সময় তার পা কাটা গেছে। এ কারণে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো বলে দাবি করে তারা। সুস্থ হওয়ার পর তাকে একটি হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করতে দেয়া হয় বলে রায়হানের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
রায়হানের দাবি, যে ঘরে তাকে রাখা হয়েছিলো, সেখানে আরও অনেক শিশু ছিলো। তাদের কারও হাত, কারও পা ছিলো না, আবার কারও চোখও ছিলো না। এ পরিস্থিতিতে শিশুটির মনে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা এবং শিশুদের অঙ্গহানির সঙ্গে কোনও চক্র জড়িত কি না, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন।
ভিক্ষা করার সময় রায়হান প্রায়ই কান্নাকাটি করতো বলে তার বর্ণনায় জানা যায়। একপর্যায়ে এক ব্যক্তি তার কান্নার কারণ জানতে চান এবং বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করেন। রায়হান নিজের বাড়ি কক্সবাজারে বলে জানালে ওই ব্যক্তি তাকে কক্সবাজারগামী একটি গাড়িতে তুলে দেন।
কক্সবাজারে পৌঁছে ক্ষুধার তাড়নায় স্থানীয় একটি মাহফিলে ভিক্ষা করতে শুরু করে শিশুটি। সেখানে পরিচিত এক ব্যক্তি তাকে চিনতে পারেন এবং তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে বাবা নাজিমউদ্দীন ছেলেকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
এদিকে দীর্ঘ সাত মাস ধরে নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন নাজিমউদ্দীন। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেয়ার পাশাপাশি স্থানীয় থানার পুলিশের কাছেও গিয়েছিলেন বলে বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ছেলের সন্ধান পাননি তিনি।
রায়হানের ঘটনাটি শিশুদের নিরাপত্তা, নিখোঁজ শিশুদের অনুসন্ধান এবং সংঘবদ্ধ ভিক্ষাবৃত্তির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কারা জড়িত, কোথায় তার পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, সেসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
শিশুদের নিরাপত্তায় অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি কোনো শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত থানায় সাধারণ ডায়েরি করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের চলাফেরা ও অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন।
সবার দেশ/কেএম




























