Sobar Desh | সবার দেশ মুনির হাসান, জেলা প্রতিনিধি (গাইবান্ধা)

প্রকাশিত: ০০:২১, ১ মার্চ ২০২৬

ব্রম্মপুত্র চরে গবেষকদের ট্রায়ালে রঙিন গাজর চাষে সফল কৃষক

ব্রম্মপুত্র চরে গবেষকদের ট্রায়ালে রঙিন গাজর চাষে সফল কৃষক
ছবি: সবার দেশ

‎উন্নত জাতের গাজর চাষে কৃষকের ভাগ্যবদলের নতুন দিগন্ত। মাইলফলক হিসাবে মাত্র ৭৫-৮০ দিনেই গাইবান্ধার চরাঞ্চলে রঙিন গাজর চাষ করে সারা ফেলে দিয়েছেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা তছলিম মিয়ার। গবেষকদের ট্রায়ালে ও তত্বাবধানে প্রথমবারের মত দারুন সফলতা পেয়েছে কৃষক। 

গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল-যেখানে একসময় বন্যা,খরা আর দারিদ্র্য ছিলো নিত্যসঙ্গী-সেখানেই এখন দেখা দিচ্ছে উচ্চ ফলনশীল জাতের গাজরের এক নতুন সবুজ বিপ্লবের সম্ভাবনা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মো. হারুন অর-রশিদ মনে করেন, উন্নত জাতের গাজর চাষ গাইবান্ধার চরবাসীর জীবন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

‎বাংলাদেশ একাডেমি অফ সাইন্সেস BAS-USDA অর্থায়নে সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) গবেষণা ব্যবস্থাপনার তত্বাবধানে ৪০টি দেশি-বিদেশী গাজরের জার্মপ্লাজম/জাত নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হারুন অর-রশিদ।

মুলত গবেষক ও পিএইচডি গবেষনারত একদল ফেলো শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় গাইবান্ধার কামারজানি চরে চালু হয়েছে একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প। এ প্রকল্পের লক্ষ্য-দেশি ও বিদেশি উচ্চফলনশীল গাজরের নতুন জাত উদ্ভাবন ও মাঠ পর্যায়ে এর বিস্তার ঘটানো।

এরই সুত্র ধরে মাত্র ৮০ দিনেই ফলাফল হিসাবে দেখা যায় প্রত্যন্ত চরে বালু ও পলি দোঁআশ মাটিতে এবার পর্যাপ্ত কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই বাম্পার ফলন হয়েছে।

৪০ জাতের গাজর নিয়ে গবেষণা: ফলন তিনগুণ পর্যন্ত বেশি

‎ড. হারুন অর-রশিদের নেতৃত্বে গবেষক দলটি দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে ৪০টি জাতের গাজর নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬টি ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ২৪টি জাত থেকে বাছাই করা হয়েছে সেরা জাতগুলো।

ফলাফল চমকপ্রদ:

দেশে প্রচলিত গাজর চাষে প্রতি হেক্টরে যেখানে গড়ে ১০ থেকে ১১ টন ফলন হয়, সেখানে নব-উদ্ভাবিত উন্নত জাতগুলো থেকে পাওয়া গেছে ৩০ থেকে ৪০ টন পর্যন্ত ফলন।

এ ছাড়া এ গাজরগুলো দেশের উষ্ণ ও খরাপ্রবণ অঞ্চলেও টিকে থাকে এবং ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই পূর্ণ ফলন দেয়। প্রতিটি গাজরের গড় ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়-যা বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক।

রঙিন গাজরে পুষ্টির জোয়ার:

‎দেশে এতোদিন মূলত কমলা রঙের গাজরই পাওয়া যেতো। কিন্তু ড. হারুনের গবেষণায় পাওয়া গেছে লাল, সাদা, হলুদ ও বেগুনি রঙের গাজর, যা শুধু দেখতে আকর্ষণীয় নয়, বরং পুষ্টিগুণেও ভরপুর।

‎এ রঙিন গাজরগুলোতে ভিটামিন-এ, অ্যান্থোসায়ানিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ প্রচলিত জাতের চেয়ে তুলনামুলক বেশি। ফলে এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হৃদ্‌রোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

অন্যদিকে গাজর থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা যাবে কেক, আইসক্রিম, পানীয় ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে-যা আমদানিনির্ভর ফুড কালারের বিকল্প তৈরি করবে।

কামারজানির চরে পাইলট প্রকল্পের সাফল্য: 

‎সম্প্রতি কামারজানি চরের স্থায়ী বাসিন্দা ও কৃষক তছলিম মিয়া (৩৫) তার নিজস্ব ৪০ শতাংশ পতিত জমিতে এবার উচ্চফলনশীল গাজরের ট্রায়াল চাষ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি কিভাবে গাজর চাষের জন্য একটি জমি প্রস্তুত করা হয় তার নমুনা হিসাবে মাটি প্রস্তুত, বীজ বপন, সার প্রয়োগ, রোগ দমন ও ফসল তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই কৃষকদের শেখানো ছিল মুলত গবেষক টিমের প্রধান কাজ।

চাষাবাদের এ সফল সূচনাকে কেন্দ্র করে কৃষকদের জন্য এক সমাবেশ ও বীজ বিতরণ ও জমি থেকে গাজর তুলে আশপাশের ১০জন কৃষকে পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিতে বিনামূল্যে প্রদান করা হয়েছে। একটি উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়, যেখানে মুখ্য হিসাবে ছিলেন অধ্যাপক ড. মো. হারুন অর-রশিদ।

‎তিনি বলেন,

চরাঞ্চলে ভুট্টা চাষে যেখানে খরচ ও ঝুঁকি বেশি, সেখানে গাজর চাষে চারগুণ পর্যন্ত মুনাফা সম্ভব। এ অঞ্চলের বালুমিশ্রিত ও পলিযুক্ত মাটি গাজরের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

‎ফলাফল চমকপ্রদ:

‎দেশে প্রচলিত গাজর চাষে প্রতি হেক্টরে যেখানে গড়ে ১০ থেকে ১১ টন ফলন হয়, সেখানে নবউদ্ভাবিত উন্নত জাতগুলো থেকে পাওয়া গেছে ৩০ থেকে ৪০ টন পর্যন্ত ফলন। এক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ জমিতে গাছর চাষ করলে ১৫-২০ হাজার টাকা ব্যয় হয় আর সেখান থেকে বিঘা প্রতি ৭০-৮০ হাজার টাকা লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন গবেষক দল ও তার আওতাধীন কৃষক তছলিম মিয়া।

‎এ ছাড়া এ গাজরগুলো দেশের উষ্ণ ও খরাপ্রবণ অঞ্চলেও টিকে থাকে এবং ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই পূর্ণ ফলন দেয়। প্রতিটি গাজরের গড় ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়-যা বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক। তবে এ চরে গাজর চাষে স্কেলে পরিমাপ করে দেখা গেল যে, একেকটি গাজর প্রায় ৩০০ গ্রাম ও তার চাইতে কিছুটা বেশি।

কৃষক, কর্মকর্তা ও গবেষকদের আশাবাদ:

চরে ভুট্টার আবাদ কমিয়ে গাজর ও অন্যান্য পুষ্টিকর ফসল চাষ করলে কৃষক স্বল্প খরচে উচ্চ মুনাফা পেতে পারে। চরবাসীর পুষ্টির চাহিদাও মিটবে।

অতিরিক্ত উপপরিচালক (ক্রপ) ও বাকৃবির পিএইচডি ফেলো মো. আবদুল আওয়াল জানান, 

গাজর চাষে রোগবালাই কম দেখা যায় এবং কীটনাশক ও সার প্রয়োগও তুলনামূলকভাবে কম লাগে। পিঁপড়া ও ছোট পোকামাকড় প্রতিরোধে সামান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলেই যথেষ্ট। তিনি জানান অন্য এলাকার চাইতে এ চরের মাটি অনেক বেশি গাজর চাষ উপযোগি। এখানকার ডাটা থেকে তাই মূলত লক্ষ করা গেছে। আশা করি এই এলাকার মানুষ গাজর চাষে আরো জোড়াল ভূমিকা পালন করবে।

‎বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও বীজ উৎপাদনের সম্ভাবনা: 

বাংলাদেশে এখনও গাজরের ৯৯ শতাংশ বীজ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, যার প্রতি কেজির দাম ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অধিকাংশই হাইব্রিড জাত হওয়ায় পুনরায় বীজ উৎপাদন করা যায় না।

‎কিন্তু ড. হারুন অর-রশিদের গবেষণা দল ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত জাতগুলো থেকে দেশীয়ভাবে বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, 

আমাদের গবেষনাকৃত বীজ হতে গাজরগুলো দেশীয় আবহাওয়ায় ফলন দিচ্ছে, তাই খুব শিগগিরই স্থানীয়ভাবে বীজ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে সরকারের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষক স্বল্পমূল্যে বীজ পাবে। আগামীতে চরের বীজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

কৃষি অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়:

এ গবেষণা কেবল চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির জন্যও এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। যেসব অঞ্চলে আগে ধান বা আলু চাষই ছিলো প্রধান, সেখানে এখন ‘উচ্চফলনশীল গাজর’ চাষের মাধ্যমে বহুমুখী কৃষি বিকাশ ঘটতে পারে।

গবেষক, কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয় কৃষকদের আশা: 

‎গাইবান্ধার চরে এ গাজর চাষ সফল হলে, তা দেশের অন্যান্য চরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে, কৃষকের আয় বাড়াবে, পুষ্টি ঘাটতি কমাবে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে। 

গাজর চাষীদের ঋন সুবিধা ও ভিন্নধর্মী শস্য ফলানোর জন্য বিনাশর্তে কৃষি সসম্প্রসারণ দফতর গুলো থেকে কৃষকদের জন্য সার,বীজ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করনের দাবি গবেষক দলের। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকরা মনে করছেন সরকার কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তাদেরকে তালিকাভূক্ত করলে আরো নিত্য নতুন ফসল উৎপাদনে আগ্রহ তৈরি হবে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।

শেষ কথা: 

‎গাইবান্ধার কামারজানির চরে এখন গড়ে উঠছে এক ‘রঙিন কৃষি বিপ্লব’- যেখানে বালুময় মাটিতে শিকড় গাড়ছে আশা, পরিশ্রম আর প্রযুক্তির সংমিশ্রণ। অধ্যাপক হারুন অর-রশিদের মতো তরুণ গবেষকদের হাত ধরে চরাঞ্চলের কৃষকরা এখন দেখছেন স্বপ্ন-যেখানে চরের কৃষিতে যুক্ত, গাজর চাষে জীবন বদলে দিতে পারে একজন কৃষকের। নতুন ফসলের দুয়ার উন্মোচনের মাধ্যমে গাইবান্ধার কামারজানির চরে কোন একদিন গাজর চাষ হতে পারে অপার সম্ভাবনার।

‎একটা ভবিষ্যৎ, যেখানে গাজরের রঙে বদলে যাবে জীবনের রঙ। সে সময়ের অপেক্ষা আর সরকারি আর্থিক সহযোগিতা পেলে চরের কৃষকরা তাদের ‎স্বপ্ন আরও জোড়াল ভাবে উন্মোচিত করতে পারবে।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

এনসিপি নেত্রী মিতু গুরুতর অসুস্থ, দোয়া চাইলেন স্বামী
বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী
রাজধানীতে খণ্ডিত লাশে রহস্য, মিললো দেহহীন মস্তক
রাতের আঁধারে জঙ্গি ছাত্রলীগের পোস্টার, কঠোর হুঁশিয়ারি ডাকসুর
খামেনি বেঁচে আছেন, যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন
ইরানের হামলায় ২০০ মার্কিন সেনা নিহতের দাবি
খামেনির লাশ পাওয়া গেছে—দাবি ইসরায়েলি কর্মকর্তার
খামেনি নেই ইঙ্গিত দিয়ে ইরানিদের বিক্ষোভের ডাক নেতানিয়াহুর
নিরাপত্তা শঙ্কায় কুয়েতে সব মসজিদে তারাবি স্থগিত
ইয়ামালের হ্যাটট্রিকে ভিয়ারিয়ালকে উড়িয়ে দিলো বার্সেলোনা
তেহরানে হামলায় খামেনির প্রাসাদ ধ্বংসের দাবি
স্টুডেন্ট ভিসায় পাঠিয়ে সর্বনাশ: মালয়েশিয়ায় প্রবাসীর মৃত্যু
নোয়াখালীতে নিখোঁজের ২ দিন পর মিললো শিশুর লাশ
ইরানি হামলার ভয়ে লাখ লাখ ইসরায়েলি বাঙ্কারে
হরমুজ প্রণালী বন্ধ করলো ইরান
মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাংদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না বিএনপি: প্রতিমন্ত্রী অমিত
গাইবান্ধায় স্কুল শিক্ষিকার হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার
আ.লীগের সাবেক এমপির কোলকাতায় মৃত্যু
পাটওয়ারীকে দুষ্টুমি না করার পরামর্শ মির্জা আব্বাসের