Sobar Desh | সবার দেশ আছমা আক্তার 

প্রকাশিত: ০১:২৩, ১৫ মে ২০২৬

আপডেট: ১২:৩১, ১৫ মে ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত: ঝুঁকিতে দেশের উপকারী পতঙ্গ 

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত: ঝুঁকিতে দেশের উপকারী পতঙ্গ 
ছবি: সবার দেশ

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ। তা সত্ত্বেও বিগত কয়েক দশকে দেশের বাস্তুতন্ত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বহু উপকারী কীট-পতঙ্গ। দ্রুত জলবাযূ পরিবর্তনের প্রভাব, আবাস ও খাদ্য সঙ্কট, অতিমাত্রায় রাসায়নিক  সার ও কীটনাশক ব্যবহার এ সঙ্কটের কারণ। বিষয়টি কৃষি অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে বলে মনে করছেন গবেষক-বিশ্লেষকগণ। 

উপকারী পতঙ্গগুলো 

প্রকৃতি থেকে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বিলুপ্তির দোরগোড়ায় থাকা পতঙ্গের মধ্যে রয়েছে ‘প্রজাপতি’। বাংলাদেশে বছর দশেক আগেও অন্তত ৬ শতাধিক প্রজাতির প্রজাপতির দেখা মিলতো। এখন সেটি কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাস্তুতন্ত্র হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাপতির মধ্যে রয়েছে, ‘গাউডি ব্যারন’।  দেখতে  চমৎকার রঙিন পাখার এ প্রজাপতিটি বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশ  থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।  ‘কমন  ভেলবেট বব’ আরেক ধরণের প্রজাপতি। ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করে ফেলায় এ প্রজাতিটি এখন প্রায় দেখাই যায় না। ‘ব্রুপিরোত’ একটি প্রজাপতির নাম। এদের প্রজনন  ক্ষেত্র ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এ কারণে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে প্রজাপতিটি। 
 
প্রজাপতির পর বিলুপ্তপ্রায় পতঙ্গের তালিকায় রয়েছে ‘গোবরে পোকা’। অর্থনীতিতে কৃষি সংস্কৃতি ক্রম:বিলুপ্তি, পরিবেশের পরিবর্তন ও গবাদি পশুর চারণভূমি কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে আবর্জনা পরিষ্কারকারী এ পোকাগুলো এখন খুব একটা দেখা যায় না।  জৈব সার ব্যবহারের মাত্রা কমে যাওয়া, বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে  উপকারী এই কীট মারা পড়ছে। 

আমাদের অতিচেনা-জানা উপকারী  বেশকিছু কীট-পতঙ্গ রয়েছে। এর মধ্যে  মৌমাছি, ভোমরা, জোনাকী পোকা, লেডিবার্ড বিটল, ফড়িং বা ড্রাগনফ্লাই, প্রেয়িং মন্টিস অন্যতম। প্রাকৃতিকভাবে যেসব বুনোমৌমাছি রয়েছে, এরা আমাদের অলক্ষ্যেই কতটা উপকার করে চলেছে-কখনও চিন্তা করে দেখি না। মৌমাছিরা উদ্ভিদের পরাগায়ন ঘটানোর কারিগর। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক প্রয়োগের কারণে বুনো মৌমাছির সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। অথচ মৌমাছি না থাকলে অধিকাংশ ফল ও ফসলের ফলন ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে যাবে। 

এখন গ্রামাঞ্চলে ঘুরে প্রাকৃতিক মৌমাছির মৌচাকের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আর্দ্রতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, ঝড়, বজ্রপাত,ভূমিকম্পসহ নানা জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত কারণে বুনো মৌমাছি অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে। ‘খাঁটি মধুর চাহিদা’ মেটানোর জন্য মৌমাছির কৃত্রিম চাষাবাদ বাড়লেও তাতে ফুল-ফলের পরাগায়নে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে ভাবনার সময় এখনই।    

জোনাকী পোকা কিংবা ‘ফায়ার ফ্লাইজ’ গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিশে আছে। সন্ধ্যার পর ঝোঁপঝাড় থেকে বেরিয়ে আসে জোনাকী পোকা। নগরায়ণ, কৃত্রিম আলোক-দূষণের কারণে জোনাকী পোকাও এখন বিলুপ্তির পথে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং দ্রত নগরায়ণ জোনাকী পোকার বংশবৃদ্ধি ও টিকে থাকায় বাঁধা সৃষ্টি করছে। অথচ জোনাকীর লার্ভা  ক্ষতিকর শামুক এবং স্লাগ খেয়ে কৃষিজমি-ফসলের সুরক্ষা দিচ্ছে। 

‘লেডিবার্ড বিটল’ নামের উপকারী পতঙ্গটি দেখতেও সুন্দর।  লাল-কমলা ও হলদে রঙের শরীরে কালো স্পট। অনেকটা আশির দশকে ঢাকার রাস্তায় দেখতে পাওয়া ভক্সওয়াগনের মতো। আত্মরক্ষার জন্য এরা দুর্গন্ধ ছড়ায় বটে, কিন্তু কৃষকের পরম বন্ধু। একটি প্রাপ্তবয়ষ্ক লেডিবার্ড হাজার হাজার ক্ষতিকর পোকার জীবন নাশ করে। একটি  লেডিবার্ড বিটল দিনে অন্তত ৫০টি ক্ষতিকর পতঙ্গ  মেরে ফেলতে পারে।
কোনও ধরণের বিষাক্ত বালাইনাশক ছাড়াই কীটপতঙ্গ খেয়ে ফসল রক্ষা করে। এটি মূলত জাবপোকা,মিলিবাগ এবং সাদা মাছি খেয়ে বাঁচে। জলবায়ুর অভিঘাত ও অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে দ্রুত মৃত্যু ঘটছে ‘লেডিবার্ড বিটল’র। 

ফড়িং বা ড্রাগনফ্লাই: 

বর্ষার শুরুতে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো অতিচেন একটি পতঙ্গ। ফড়িং সাধারণত: বাহারি ও নানা জাতের হয়। ‘কমন’ জাতের ফড়িং হচ্ছে ‘ড্রাগন ফ্লাই’ এবং ‘ড্যামজেলফ্লাই’। ড্রাগন ফ্লাইয়ের আকার বড়। শরীর সুঠাম ও তুলনামূলক শক্ত। 

আরও পড়ুন <<>> যত্রতত্র মোবাইল টাওয়ার, বারোটা বাজাচ্ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের

ড্যামজেলফ্লাই আকারে ছোট। শরীরও সরু, নমনীয়। ফড়িংয়ের চারদিকেই চোখ থাকে। ইচ্ছে মতো ঘোরাতে পারে চোখ। এ কারণে ফড়িং স্বভাবগতভাবেই শিকারি। এরা জীবাণু ছড়ানো বিরক্তিকর মশা-মাছির উপদ্রত থেকে আমাদের রক্ষা করে। মশা-মাছি ফড়িংয়ের প্রধান খাদ্য।   ফড়িংয়ের লার্ভা এবং পূর্ণাঙ্গ ফড়িং প্রচুর পরিমাণে মশার লার্ভা ও মশা বিনাশ করে। ফড়িং মশা ও মাছি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ফড়িং কয়েক মিনিটে শত শত মশা বিনাশ করতে পারে। কোনও এলাকায় ফড়িংয়ের উপস্থিতির মানে হচ্ছে, সেখানকার পানির গুণগত মান ভালো। বাস্তবতা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংসের ফলে ফড়িংয়ের বংশ বিস্তার বিপন্ন হতে চলেছে। বিশেষ করে রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফড়িং ক্রমশ: দুর্লভ পতঙ্গে পরিণত হচ্ছে।

প্রেয়িং মেন্টিস: 

উপকারী পতঙ্গটির সত্যিাকারার্থে  একক বাংলা নাম নেই। এটিকে ‘প্রার্থনারতম দীর্ঘপদ পতঙ্গ’ বলা চলে। লম্বা পা এবং অদ্ভুত আকৃতির কারণে মানুষ অনেক সময় পতঙ্গটিকে ভয় পায়। অথচ এর কার্যক্রম মানুষকে উপকৃত করে। কিম্বুতকিমাকার এ পতঙ্গ ফসলের জন্য ক্ষতিকর পঙ্গপাল, ঘাসফড়িং ও অন্যান্য ক্ষতিকর পতঙ্গ গ্রাসে পারদর্র্শী। প্রার্থনারতম দীর্ঘপদের এ পতঙ্গের সার্বক্ষণিক প্রার্থনাই থাকে জৈবিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকা দমন। পোকামাকড় তাই এটিকে জমের মতো ভয় পায়। প্রেয়িং মেন্টিস ফল ও ফসলে কীটনাশকের প্রয়োজনীয়তা কমায়। 

কালো ভ্রমর: 

ভ্রমর কইয়ো গিয়া..। ভ্রমরাকে নিয়ে বাঁধা এ গানে কণ্ঠ মেলায়নি এমন বাংলাদেশী কম আছে। আমাদের সংগীত, কাব্য-সাহিত্য, লোককথা এবং প্রেমিকার চোখের সৌন্দর্য বর্ণনায় ‘ভ্রমর’ প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। এটিও একটি উপকারী, রোমশ পতঙ্গ। ভ্রমর এ ফুল থেকে ওই ফুলে বিচরণ করে ফুলের পরাগায়ন ঘটায়। এরা ‘অলি’, ‘মধুকর’ নামেও পরিচিত। মৌমাছির চেয়ে কিছুটা বড় ভ্রমর ফুলের পরায়গায়নে ভূমিকা রেখে আমাদের নিত্য ঋণী করে রেখেছে। তবে উপকারী পতঙ্গ হলেও ভীমরুল জাতীয় ভ্রমর অনেক সময় বিষাক্ত হয়ে থাকে। ক্ষতির চেয়ে উপকারী ভূমিকাই বেশি। ভ্রমর জৈবিক উপায়ে ক্ষতিকর পোকা দমনে সুদক্ষ, কার্যকর। এটিও কীটনাশকের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে। 

আবহমান বাংলায় অতিচেনা আমাদের চারপাশের উপকারী পতঙ্গগুলো ক্রমশই বিলুপ্ত হতে চলেছে। বিজ্ঞানীরা এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে। দ্বিতীয়ত: দায়ী করছেন সরাসরি মানবসৃষ্ট কারণকে। কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার, রাসায়নিক সারের ব্যবহার পতঙ্গগুলোর বাস্তু সংস্থান ধ্বংস  করছে। মানুষ নগরায়ণের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বনজঙ্গল কেটে সাফ করা হচ্ছে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ফেলায় পতঙ্গগুলোর প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্দি ও পরিবেশ দূষণ ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গের জীবনচক্রকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা: 

ক্রমশ বিপন্ন পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। সবুজায়ন বাড়াতে হবে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় ও দেশীয় গাছ রোাপন করতে হবে। এতে কীট-পতঙ্গের আশ্রয়স্থল তৈরি হবে। রাসায়নিকের পরিবর্তে জৈবিক পদ্ধতিতে পোকামাকড় দমনের কৌশল খুঁজতে হবে।  বিজ্ঞানীরা এ মর্মে সতর্ক করছেন যে, কীটপতঙ্গ  ছোট হলেও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে এদের ভূমিকা অপরিসীম। এরা হারিয়ে  গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই বিষয়ে মনোযোগ দেয়া এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দিচ্ছেন তারা। 

সম্পর্কিত বিষয়:

শীর্ষ সংবাদ:

ফিটনেসবিহীন গাড়ির চালকের আসনে তারেক রহমান: হাসনাত
ড. ইউনূসকে হেনস্তা, ৪ আওয়ামী জঙ্গি শনাক্ত
এনসিপির শীর্ষ চার পদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত, বদলাচ্ছে নেতৃত্ব
ড. ইউনূসকে হেনস্তা, ১২ সাবেক উপদেষ্টার নিন্দা
মুচলেকা দিয়ে পুলিশি পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়লেন চুয়েট ভিসি
ড. ইউনূসের হেনস্তার দায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর: নাহিদ
যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসকে হেনস্তা, সরকারের নিন্দা
ড. ইউনূস ভালো আছেন, কোনও ক্ষতি হয়নি: লামিয়া মোরশেদ
মোদিবিরোধী আন্দোলনে বাজলো হাসিনাবিরোধী প্রতিবাদী গান
পাখি আমদানির আড়ালে শত কোটি টাকা পাচার
ওয়ান ব্যাংকে অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ
বিএনপি’র সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ আর নেই
ইরানে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি: ট্রাম্প
ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় জুলাই জার্নালিস্ট ইউনিটির নিন্দা ও প্রতিবাদ
টেস্টে লিটন দাসের বিশ্বরেকর্ড
চুয়েটে ২৪ ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ উপাচার্যসহ ১১ জন
নিউইয়র্কে ইউনূসকে হেনস্তা, ব্যবস্থা নেবে সরকার: তথ্য উপদেষ্টা