চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ভরসা প্রাণিসম্পদ খাত, সেবার সংকটে শঙ্কা
নদ-নদীবেষ্টিত উত্তরের জেলা গাইবান্ধার চরাঞ্চল একসময় ছিলো নদীভাঙন, বন্যা, খড়া আর অনিশ্চয়তার এক মুর্তপ্রতীক। জেলায় ১৬৫টি চর ও দ্বীপচরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বালুচরে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ অবহেলিত থাকলেও এখন সেখানেই গড়ে উঠছে গবাদিপশু পাখি পালনের উপযোগী এক নীরব স্থান।
কৃষি কাজে যুক্ত স্থানীয় কৃষক ও গবাদি পশু পালনকারী ফার্মার/ খামারিরা বলছেন, গরু-মহিষ হচ্ছে তাদের ‘ভবিষ্যতের পুঁজি’ যা তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিতের সময় অসহায় কৃষক ও খামারির সহায় হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের আয় স্থিতিশীল রাখে এ খাত। কৃষি নির্ভর চরে দুধ ও মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে চরাঞ্চলের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। সম্ভাবনার দুয়ার যেমন উন্মোচন হচ্ছে তেমনি তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের দারুন সুযোগ।
সম্প্রতি জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের সর্বশেষ ও এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কোরবানির বাজারকে টার্গেট করে জেলায় এবার প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ২৭৭টি পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছিলো। এর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ছিলো প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার, যা মোট গবাদীপশুর প্রায় ৬০ শতাংশ। এটি নিশ্চিত করেছেন জেলার কর্মকর্তারা। ছাগল ও ভেড়া ছিলো অবশিষ্টাংশ। চরে গরু মহিষ ছাড়াও ছাগল ভেড়া পালনে সফলতার পাশাপাশি বিশেষ করে নারীরা তাদের আত্নকর্মস্থানের পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে এসব গবাদিপশুর প্রায় ৪৭ থেকে ৫০ শতাংশই পালন করা হয় প্রত্যন্ত এ চরাঞ্চলে। উন্মুক্ত চারণভূমি প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতার কারণে চরাঞ্চলের পশু দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয়ও কম হয়ে থাকে। চরে অধিকাংশ সময় দেখা যায় চোখ জুড়ানো হেক্টর কি হেক্টর ভূট্টার আবাদ। ভূট্টার সাইলেজ ও সবুজ পাতা গবাদিপশুর খাদ্যের যোগান ও চাহিদা মেটাতে বিশাল ভূমিকা পালন করে থাকে। মুলত এ কারনে দুধ উৎপাদনের দিক থেকে চরাঞ্চলের অপার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হিসাবে ধরা হয়ে থাকে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চরাঞ্চলের অধিকাংশ খামারি দেশি গাভী পালন করে থাকেন। অনেক খামারিদের আবার দুই চাঁরটি গরুর সাথে মহিষও আছে ঘরে। দেশি গাভীগুলো দৈনিক গড়ে দেড় থেকে দুই লিটার দুধ দেয় এবং মহিষের দুধ বাজারে চাহিদা থাকায় মহিষের জাত ভিত্তিতে উন্নত জাতের প্রায় ১টি মহিষ গড়ে ১৮-২০ লিটার দুধ দিতে সক্ষম। ভালো জাতের একটি মহিষের দুধ উৎপাদন নির্ভর করে তার জাত, খাবার, যত্ন ও পরিবেশের ওপর। মহিষের দুধে গরুর দুধের তুলনায় ফ্যাট বেশি (৬–৮% বা তার বেশি), তাই ঘি ও দই বানাতে খুব ভালো ও উপযোগী।
ভালো খাবার (ঘাস, ভুসি, খৈল), পরিষ্কার পানি ও নিয়মিত চিকিৎসা পেলে দুধ বাড়ে। অনুমান করা হচ্ছে, চরাঞ্চল থেকে বছরে প্রায় কয়েক কোটি লিটার দুধ উৎপাদন সম্ভব যা জেলার মানুষের দুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে ও দুধের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পাশ্ববর্তী দুধের বাজার গুলোতেও সরবরাহ করা যেতে পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চরাঞ্চল দুধ উৎপাদনের বড় ঘাটি ও সম্ভাবনাময় অঞ্চল। উন্নত জাতের সিমেন ব্যবহার ও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। আমরা খামারিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে পশু পালন করতে পারেন। প্রাণিসম্পদ খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) এবং মহিষ উন্নয়ন প্রকল্প ও এর সাথে যুক্ত ফডার প্রকল্প ছাড়াও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য সু-নিদিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে খামারিদের আত্ন-নির্ভরশীল করার প্রচেষ্ঠা চলমান রয়েছে।
মাঠের চিত্র থেকে বলা যায়, মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রেও চরাঞ্চলের সক্ষমতা একেবারেই কম নয়। একটি মাঝারি আকারের দেশি গরু থেকে গড়ে ১৬৫ থেকে ১৭৭ কেজি মাংস পাওয়া যায়। বড় গরু থেকে ১৮০ থেকে ৩০০ কেজি মাংস পাওয়া যায়।প্রায় উন্নত জাতের ষাঁড়ের বুল ও সিমেন ব্যবহারের মাধ্যমে এ মাংসের পরিমাণ দ্বিগুণ করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিকল্পিত সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চল থেকে বছরে অন্তত ৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন মাংস উৎপাদন সম্ভব। এটি স্থানীয় ও জাতীয় বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রাখতে পারে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তরুন কুমার দত্ত জানিয়েছেন, মাংস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত জাতের পশু পালন ও সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরি। যা গবাদীপশুকে সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। কর্মকর্তার ধারনা মতে তিনি মনে করেন এ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ সঠিক ভাবে বাস্তবায়িত হলে খামারিরা লাভবান হবেন। এ প্রক্রিয়াটি তারা তাদের নিজেদের অবস্থান থেকে চলমান রেখেছেন।
সদর উপজেলার গোঘাট গ্রামের বাসিন্দা তছলিম মিয়া জানান, আগে শুধু ধান চাষ করে সংসার চালাতে তিনি হিমশিম খেতেন। এখন উন্নত জাতের দুইটি গরুর দুধ বিক্রি করে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শত টাকা থেকে এক হাজার টাকা আয় করছেন। এতে তার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে।
একই গ্রামের তোলাপি বেগম মনে করেন, গরু পালন করে তার সারাদিন সময় কাটে। সন্তানের মত লালন পালন করে বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি তার পরিবারে আয়ের যোগান দিয়ে আসছেন। পর্যাপ্ত সুবিধা পেলে বহুদুর এগিয়ে যেতে চান তিনি।

‘সবার দেশ’ প্রতিবেদকের একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অনেক সংগ্রাম করে তিনি তার পরিবারটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। এক সময় তার পরিবারিক জীবনে নেমে এসেছিলো নদী ভাঙ্গনের মত অনেক দুর্যোগ। সে দুর্যোগ কাটিয়ে এখন তিনি স্বচ্ছল।
ফুলছড়ির ফজলুপুর চরের খামারি জাহাঙ্গীর আলম ‘সবার দেশ’কে বলেন, তার খামারে ১৫টি গরু রয়েছে এবং মাঠে পর্যাপ্ত ঘাস থাকায় কেনা খাবারের তেমন প্রয়োজন হয় না। পশুর রোগবালাইও তুলনামূলক কম।
তিনি বলেন, চরে গরু পালনে খরচ খুবই কম, তবে পশুগুলোর যত্ন নিতে হয় সর্বক্ষন। আয় ভালো হওয়ায় দুধ বিক্রি করে তার ভালোভাবে সংসার চলছে। যদি বাজারব্যবস্থা আরও উন্নত হয়, তাহলে খামারিরা লাভবান হবে। এজন্য পর্যপ্ত সরকারি সহায়তা ও সুযোগ সুবিধার প্রয়োজন।
সামনে আসছে কৃষক কার্ড। এর আওতায় খামারিদের সংযুক্ত করতে পারলে চরেই হতে পারে গবাদিপশু পালনের অপার সম্ভাবনা।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে বাড়িঘরে পানি উঠলে পশুর খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়। অনেক সময় কম দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হন খামারিরা। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পশুচিকিৎসার সীমাবদ্ধতাও অনেক বড় ফ্যাক্টর। অসুস্থ পশুকে মূল ভূখণ্ডে নিতে সময় ও অর্থ ব্যয় হয় অনেক, ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানিও ঘটে। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকরাই প্রাথমিক চিকিৎসা দেন, কিন্তু বিশেষায়িত সেবার তেমন সুযোগ না থাকায় হতাশ এখানকার খামারিরা। সীমিত সেবার উপর নির্ভর করতে হয় অনেকের। এ শংকা কাটিয়ে উঠতে জরুরি সেবা চালু করার আহবান তাদের।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, চিলিং সেন্টার ও দুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন।
তবে স্থানীয়ভাবে চিলিং পয়েন্ট না থাকলে মাথার উপর কিছুটা ঠাই পেয়েছেন অনেক খামারি। তাদের উৎপাদিত দুধ ভ্যানে করে মিল্কিং ক্যানেভরে কিছু স্থানীয় পাইকার বাজারদর অনুযায়ী ক্রয় করে সাদুল্লাপুরে অবস্থিত শেখ দই ঘরে বিক্রয় করায় তারাও লাভবান হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে শেখ দই ঘরের উদ্যোক্তা জরিপ ও মোস্তফা শেখ সবার দেশ প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খামারিদের সহযোগিতায় তার প্রতিষ্ঠান আজ ডেইরি হাবের আওতাভুক্ত। ন্যায্যমুল্যে দুধ ক্রয় করে খামারিদের ভাগ্য পরিবর্তনে ও তাদের সুখে দুখে পাশে থেকে তাদের সকল ক্ষেত্রে বিশেষকরে আর্থিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রাণিসম্পদের এ খাত পুনরুজ্জীবিত করে ভবিষ্যতে বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন এ তরুন উদ্যোক্তা।
গবাদিপশু পালনে নারীদের অংশগ্রহণ চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সকালে গোয়াল থেকে গরু বের করা, খাদ্য সংগ্রহ, গোয়াল পরিষ্কার, দুধ দোহন ও পশু পরিচর্যার অধিকাংশ কাজেই নারীরা করে থাকেন। অনেক পরিবারে নারীর এ শ্রম অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পথ উন্মোচন করেছে।
চরাঞ্চলের কৃষকেরা বলেন, নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া গবাদিপশু পালনের কাজ কোন দিনেই সফল হতো না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চরাঞ্চলকে পরিকল্পিত চারণভূমি হিসেবে ঘোষণা করা, উন্নত ঘাস চাষ, স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা এবং বাজার সংযোগ উন্নত করা গেলে দুধ ও মাংস উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে প্রান্তিক মানুষের আয় বাড়বে, অন্যদিকে জেলার অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথভাবে সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গাইবান্ধার চরাঞ্চল দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা।
নদীভাঙন ও অনিশ্চয়তার মুখে চরবাসী তাদের শ্রমে নতুন সম্ভাবনা ইতিমধ্যে তৈরি করেছেন। বিস্তীর্ণ বালুচরে চরছে গরু-মহিষের পাল, এ দৃশ্য কেবল গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, এটি প্রাণিসম্পদ খাতে আমুল পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
খামারিরা সঠিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও সরকারি সহায়তা পেলে গাইবান্ধার চরাঞ্চল থেকে উৎপাদিত দুধ ও মাংস দেশের পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে এবং দারিদ্র্য পেরিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে এ প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনপদ।
সবার দেশ/কেএম




























