আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হুমকি উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের
‘একদিন পুলিশ বানিয়ে দিন, পিটিয়ে সোজা করে দেবো’
ভারতে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর-মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সহিংসতার হুমকি দিয়েছে কয়েকজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতা ও স্বঘোষিত ‘গো-রক্ষক’। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে আন্দোলনকারীদের মারধরের আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি দিল্লি পুলিশের দায়িত্ব একদিনের জন্য তাদের হাতে তুলে দেয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য সিয়াসাত ডেইলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এসব হুমকি ভারতের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যন্তর-মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে স্বঘোষিত গো-রক্ষক স্বতন্ত্র ভরদ্বাজসহ কয়েকজনকে লাঠিসোটা হাতে মহড়া দিতেও দেখা যায়।
গত ২০ জুলাই শিক্ষার্থীদের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে দিল্লি পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। সে সময় সাদা পোশাকে কিছু ব্যক্তিকেও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালাতে দেখা যায়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশের সদস্য ছিলেন।
এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া এক ভিডিও বার্তায় স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ দাবি করেন,
যারা সাদা পোশাকের লোকদের নিয়ে প্রশ্ন করছেন, তারা পুলিশ সদস্য ছিলেন। কিন্তু আসল গুন্ডারা এখন মাঠে নামবে। দিল্লিতে আসল গুন্ডাগিরি কী, তা এবার দেখানো হবে।
তিনি আরও বলেন, দিল্লি প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি—একদিনের জন্য আমাদের মতো গোঁড়া সনাতনপন্থীদের দিল্লি পুলিশের দায়িত্ব দেয়া হোক। ইউনিফর্ম লাগবে না, শুধু হাতে লাঠি দিন। আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে সোজা করতে না পারলে আমার নাম স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নয়।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া কাকরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মুখপাত্র সৌরভ দাস অভিযোগ করেন, উগ্রপন্থী এসব ব্যক্তিকে পুলিশ কার্যত প্রশ্রয় দিচ্ছে। তার দাবি, স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ এর আগে যন্তর-মন্তরে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আন্দোলনকারীর বাবাকে মারধর করে গুরুতর আহত করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে এসব উগ্রপন্থী নেতার সঙ্গে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কয়েকজন নেতার ছবি দেখা যায়। তবে এসব ছবি থেকে কোনও সাংগঠনিক বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে গাজিয়াবাদভিত্তিক ‘হিন্দু রক্ষা দল’-এর নেতা পিঙ্কি ভাইয়া এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হিন্দুবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে ২৬ জুলাই যন্তর-মন্তরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, তার সংগঠন সেখানে গিয়ে ‘দেশবিরোধীদের’ প্রতিহত করবে।
একই ভিডিওতে তিনি পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ তোলেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় অভিষেক ঠাকুর নামে আরেক ব্যক্তি ভিডিও বার্তায় বলেন, দিল্লি পুলিশ যদি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, আমাকে ছয় ঘণ্টা সময় দিন। সরকার একদিনের জন্য পুলিশে সুযোগ দিলে আন্দোলনকারীদের কীভাবে সামলাতে হয়, তা দেখিয়ে দেবো।
বিভিন্ন ভিডিওতে ‘জয় শ্রী রাম’ ও ‘মারো মারো’ স্লোগান দিতে এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ২০ জুলাইয়ের অভিযানের পর থেকে যন্তর-মন্তরে তাদের খাবার পৌঁছাতে বাধা দেয়া হয়েছে এবং বাইরের সহায়তাও সীমিত করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ক্রমাগত হুমকি, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এবং সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর শনিবার (২৫ জুলাই) আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা সাময়িকভাবে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন।
দ্য সিয়াসাত ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সহিংসতার হুমকি এবং এ নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা ভারতে গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























