গো-পাচারের গুজবে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু নিপীড়ন
ভারতে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে দুই মুসলিম যুবক হত্যা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির মাটিগাড়া-বাগডোগরা এলাকায় গবাদিপশু পাচারের সন্দেহে একদল মানুষের হামলায় দুই মুসলিম যুবক নিহত হয়েছেন।
শনিবার (৩ অক্টোবর) ভোররাতে তারাবাড়ি এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান ও একটি গাড়িকে ঘিরে ধরে কয়েকজনকে মারধরের পর এ ঘটনা ঘটে। হামলার সময় একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং হামলায় জড়িতদের শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার ভোরের মধ্যে মাটিগাড়ার তারাবাড়ি এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান ও একটি চারচাকা গাড়ি প্রবেশ করে। স্থানীয়দের একাংশ গাড়িগুলোকে সন্দেহজনক মনে করে ঘিরে ফেলেন। পরে গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালানো হয়।
এ ঘটনায় পিকআপ ভ্যানের চালক শহিদ আখতার গুরুতর হামলার শিকার হন। তাকে পাথর দিয়ে আঘাত করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার বাড়ি উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায়। হামলার পর পিকআপ ভ্যানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
অন্য গাড়িতে থাকা চারজন সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাদের ধাওয়া করে বাগডোগরার ধিমাল বস্তি এলাকায় নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পুলিশ তাদের উদ্ধার করে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাদ মহম্মদ নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়। নিহত দুজনের একজন উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার এবং অপরজন হরিয়ানার বাসিন্দা বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হামলায় আমির সাত্তার, আক্রম খান ও আরিফ খান আহত হয়েছেন বলে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে। এদিকে আরেকজন কোনোভাবে পালিয়ে পানিঘাটা থানায় আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর মাটিগাড়া ও বাগডোগরা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুড়ে যাওয়া পিকআপ ভ্যান এবং ক্ষতিগ্রস্ত আরেকটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার পেছনে গবাদিপশু চুরির সন্দেহের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে গাড়িতে সত্যিই গবাদিপশু ছিলো কি না, কিংবা সেখানে কোনও পাচারের ঘটনা ঘটছিলো কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় গাড়ি থেকে গরু উদ্ধার হয়েছিলো কি না, সেটিও তখন পর্যন্ত স্পষ্ট ছিলো না।
শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটন পুলিশের এসিপি ইস্ট অনির্বাণ মজুমদার জানিয়েছেন, ঘটনাটি প্রথমে মাটিগাড়ার তারাবাড়ি এলাকায় শুরু হয় এবং পরে বাগডোগরা ও পানিঘাটা থানা এলাকার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো ঘটনার কারণ ও হামলাকারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুরো রাজ্য জুড়েই যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে এবং ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনিই যে এখন বিচারব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠছে, তার প্রমাণ মিলেছে কোলকাতার উপকণ্ঠে সোনারপুরেও। সেখানে পুরোনো খুনের আক্রোশের জেরে গোপাল হালদার নামের এক যুবককে গ্যারেজ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে একইভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এভাবেই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জনতা স্বঘোষিত বিচারকের ভূমিকা পালন করছে। এ সার্বিক নৈরাজ্য ও বিচারহীনতার বাতাবরণে ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলমানরা আজ এক চরম অস্তিত্বসংকট ও ভীতির মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের রুটিরুজির পথ যেমন ক্রমশ সংকুচিত করা হচ্ছে, তেমনই রাস্তায় বেরোলে স্রেফ সন্দেহের বশে যখন-তখন প্রাণ হারানোর আতঙ্কে প্রতিটি মুহূর্ত কাটাতে হচ্ছে। মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের এ নগ্ন চিত্র গোটা উপমহাদেশের সভ্য সমাজের কাছেই আজ এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন।’
সবার দেশ/কেএম




























