উত্তাল ভারতের মণিপুর, দুই দিনে ৬ মৃত্যু
তামেংলংয়ে দুই নারীকে গুলি করে হত্যা, পুড়ল একাধিক ঘর—নতুন করে উত্তেজনা
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে ফের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। তামেংলং জেলায় সশস্ত্র হামলায় দুই নারী নিহত এবং কয়েকটি কৃষিঘর বা ফার্মহাউস পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এর মাত্র দুই দিন আগে তামেংলং ও নোনি জেলায় পৃথক হামলায় আরও চারজন নিহত হয়েছিলেন। ফলে ১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ওই দুই জেলায় সংঘাত ও হামলায় অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তামেংলং জেলার লেইসাংফাই এলাকার একটি প্রত্যন্ত কৃষিজমিতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ওই সময় সেখানে থাকা দুই নারীকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা গুলি করে হত্যা করে। নিহতদের পরিচয় ৬০ বছর বয়সী চোংগা সিতলহৌ এবং ৩০ বছর বয়সী কিমবোই সিংসন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, চোংগা সিতলহৌ জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছিলেন। অন্যদিকে কিমবোই সিংসন সম্প্রতি নার্সিং কোর্স শেষ করে পরিবারের কৃষিকাজে সহায়তা করতে বাড়িতে ফিরেছিলেন। হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে কৃষিঘর
হামলার সময় কয়েকটি কাঁচা কৃষিঘরেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, হামলার পর কয়েকজন গ্রামবাসীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। তবে নিখোঁজের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি এবং ঘটনার তদন্ত চলছে। ফলে বিভিন্ন কুকি সংগঠন হামলাটিকে সন্দেহভাজন নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করলেও এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর তামেংলং ও নোনি জেলায় পৃথক দুটি হামলায় চারজন কুকি-জো বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
তামেংলংয়ের টোলেন গ্রামে ভোররাতে হামলায় লিংজাংগাই সিংসিট নামে এক নারী নিহত হন। তার স্বামী সাইনেহ সিংসিট গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান। তাদের ছয় বছর বয়সী সন্তানও গুলিতে আহত হয়।
একই দিন নোনি জেলার লংপি গ্রামে পৃথক হামলায় জুলি গ্যাংটে ও থাংরোয়েল গ্যাংটে নিহত হন। ওই হামলায় আরও এক নারী নিখোঁজ রয়েছেন বলে কুকি সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
ওই হামলাগুলোর পেছনে সন্দেহভাজন নাগা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যদের দায়ী করেছে কয়েকটি কুকি সংগঠন। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত তদন্ত-ভিত্তিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
লাশ গ্রহণে আপত্তি কুকি সংগঠনের
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পর কুকি নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কুকি ইনপি মণিপুর নিহত দুই নারীর লাশ গ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য, নিহতদের পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত হলেও সুবিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা লাশ গ্রহণ করবে না। তাদের অভিযোগ, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেও কুকি ইনপি জিরি-তামেংলং-নোনি ২৪ ঘণ্টার অর্থনৈতিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিলো।
দীর্ঘ সংঘাতের নতুন অধ্যায়
মণিপুরে ২০২৩ সালের মে মাস থেকে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সংঘাত চলে আসছে। এ সংঘাতের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং সম্পদহানির ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক সহিংসতা মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের তামেংলং ও নোনি জেলার কুকি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেও হামলার প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনও বাকি।
রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন করে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো। বিশেষ করে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে চাওয়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং তদন্তের অগ্রগতির ওপর এখন নজর রয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে।
সূত্র: টাইমস নাউ
সবার দেশ/এমকেজে




























