ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো: আসিফ নজরুল
ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের ঘটনায় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, দেশের মর্যাদা, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় আসিফ নজরুল বলেন, তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত মূলত তারই ছিলো। বিষয়টি তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যেও স্বীকার করেছেন। ফলে এতদিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ নিয়ে তদন্ত করে তা ঘটা করে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এর আগে মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এক সংবাদ সম্মেলনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেয়ার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের নির্দেশে গঠিত কমিটির প্রধান ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।
তদন্ত প্রতিবেদনের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আসর বর্জনের মতো সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত কোনও একক ব্যক্তির নেয়া সমীচীন নয়। প্রতিবেদনে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর জানান, প্রতিবেদনে ‘একজন ব্যক্তি’ বলতে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে বোঝানো হয়েছে।
সিদ্ধান্তটির মূল দায় কার—এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটির প্রধান ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ বলেন, এটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিলো। এর বাইরে আর কী বলবো!
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রতিক্রিয়া জানান আসিফ নজরুল। সেখানে তিনি বলেন, ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মূলত তারই ছিলো। তিনি নিজেই বিষয়টি একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন। তাই এতদিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করে তা প্রকাশ করার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না বলেও মন্তব্য করেন।
ভারতে দল না পাঠানোর প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসিফ নজরুল বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অসম্মানজনকভাবে বাদ দেয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
এরপর খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদ হিসেবে ভারতে দল না পাঠানোর অবস্থান নেয়া হয় বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, জাতীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ক্রিকেটার, সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিলো সিদ্ধান্তের প্রধান বিবেচনা।
নিজের আশঙ্কার পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রাথমিক মূল্যায়নের কথাও তুলে ধরেন আসিফ নজরুল। তিনি দাবি করেন, আইসিসির প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভারতে বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে তিনটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছিলো। এর মধ্যে ছিলো দলে মোস্তাফিজুর রহমানের উপস্থিতি, বাংলাদেশি সমর্থকদের অবাধ চলাচলের সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিষয়টি বিবিসি বাংলাতেও প্রকাশিত হয়েছিলো বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আসিফ নজরুল আরও দাবি করেন, টুর্নামেন্টটি অন্য কোনও নিরপেক্ষ দেশে আয়োজনের জন্য শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবে জোরালো চেষ্টা চালানো হয়েছিলো। কিন্তু আইসিসিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রভাবের কারণে সে উদ্যোগ সফল হয়নি। বিষয়টি সমাধানে ভারতের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনও যোগাযোগ করা হয়নি বলে জানান তিনি।
নিজের নেয়া সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সাবেক এ ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, একটি ছোট দেশ বলে কেউ ইচ্ছেমতো বাংলাদেশকে অপমান করবে আর বাংলাদেশ সব সময় তা মেনে নেবে—এমন প্রত্যাশা ঠিক নয়। তিনি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাস করেন, তবে মাথা নত করে সবকিছু মেনে নেয়ার পক্ষে নন।
এদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কোনও একক ব্যক্তির মাধ্যমে বিশ্বকাপ বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ফলে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত ছিলো, নাকি সরকারের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত ছিলো—এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে আসিফ নজরুলের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তিনি এখনও মনে করেন তৎকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থবিরোধী ছিলো না। বরং নিরাপত্তা, জাতীয় মর্যাদা ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটিই ছিলো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।
সবার দেশ/কেএম




























