Sobar Desh | সবার দেশ স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৩:১২, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জুলাই গণহত্যা: ওবায়দুল কাদের-আরাফাতসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

৭ আসামিরই সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে শহীদ-আহত পরিবারের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ

জুলাই গণহত্যা: ওবায়দুল কাদের-আরাফাতসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ছয়জন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

৯ অভিযোগে বিচার

জুলাই আন্দোলন দমনে পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, হামলা, হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মোট নয়টি অভিযোগ আনা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ মামলাটির রায় ঘোষণা করা হলো।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ তারা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করিয়েছে। পাশাপাশি আসামিদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড, এসব অডিওর ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সহায়ক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সোমবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, মামলার প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিল প্রসিকিউশন।

‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ

মামলার যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিলো—জুলাই আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করা হয়েছিলো এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো।

রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় বলেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও ও ভিডিওতে এর প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয় বলে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ করে।

যুবলীগ-ছাত্রলীগকে মাঠে থাকার অভিযোগ

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম দাবি করেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কথোপকথনের অডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব কথোপকথন থেকে যুবলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশ দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসিকিউশনের আরও অভিযোগ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে মাঠে থেকে হামলার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।

তামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাপক হামলা চালালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে পারে—এটি জানা সত্ত্বেও হামলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে অডিও-ভিডিও, সাক্ষ্য এবং ফরেনসিকসহ বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

‘হত্যার নির্দেশ দেননি’

তবে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের খালাস দাবি করেন।

ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তি দেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। তবে তার তিন মক্কেল কোনও কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না।

কমান্ড রেসপনসিবিলিটির প্রশ্নে তিনি কেবল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন। তার দাবি, তার মক্কেলরা কাউকে হত্যা করেননি এবং হত্যার নির্দেশও দেননি।

চার নেতার পক্ষে ভিন্ন যুক্তি

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম আসেনি।

অন্যরা নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন—রাষ্ট্রপক্ষের এমন অভিযোগও নাকচ করেন ইশরাত জাহান। ট্রাইব্যুনাল জানতে চায়, কোনও নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো কি না। জবাবে তিনি বলেন, জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা চলছিলো। ফলে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিলো না।

নারীদের আহত হওয়ার কথা রাষ্ট্রপক্ষ বারবার উল্লেখ করলেও মামলায় কোনও নারী সাক্ষী উপস্থাপন করা হয়নি বলেও যুক্তি দেন তিনি। সাক্ষ্যপ্রমাণেও তার মক্কেলদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের যথেষ্ট প্রমাণ নেই দাবি করে তাদের খালাস চান আইনজীবী।

‘যৌথ অপরাধে দায়’

আসামিপক্ষের যুক্তির জবাবে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তার বক্তব্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে একই উদ্দেশ্যে কোনও গোষ্ঠী অপরাধ করলে সরাসরি অপরাধ সংঘটনে অংশ না নিলেও সংশ্লিষ্ট সদস্যদের দায় নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, প্রথমে ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। পরে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয়া হলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানো হয়।

যেভাবে শেষ হলো বিচার

এ মামলাটি প্রথমে ৫/২০২৫ নম্বর মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত বছরের ১৮ জুন তদন্ত শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।

সেদিনই অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। পরে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়া হয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এবং একই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২ আগস্ট। এরপর ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ১৭ আগস্ট শেষ হয়। ওই দিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

সম্পত্তির অর্ধেক যাবে শহীদ পরিবারের কাছে

মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি সাত আসামির অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের মধ্যে বণ্টন করা হবে।

ফলে জুলাই গণহত্যা মামলার এ রায় শুধু আসামিদের শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; একই সঙ্গে আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সম্পদ বণ্টনের একটি নির্দেশনাও এসেছে রায়ে।

সবার দেশ/এমকেজে

শীর্ষ সংবাদ:

পশ্চিমবঙ্গে গো-মাংসে কড়াকড়ি, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন নাগরিকরা
জুলাই গণহত্যা: ওবায়দুল কাদের-আরাফাতসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড
বিদ্যুতে লোপাট: ক্যাপাসিটি চার্জে ২.৯ লাখ কোটি টাকা
ভাঙা পিঠ-কাঁধ নিয়ে ৫০ ঘণ্টা ইরানের পাহাড়ে মার্কিন সেনা
তিন মাসে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়লো ৫ হাজার
চাঁদাবাজি-দখলবাজির কবর রচনার হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের
বিমা খাতেও বিশাল দুর্নীতি হয়েছে আ.লীগের আমলে: অর্থমন্ত্রী
একাদশে ভর্তিতে ১০ লাখ আবেদন, ফল ১৭ সেপ্টেম্বর
ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে জামায়াতের বাজি সেলিম-সাদিক
ওমানে বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সেবা পাঁচ দিন বন্ধ
২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
কে গুলি করেছিলেন জিয়াউর রহমানকে, জানালেন মোজাফফর
ঢাকা উত্তরে আসিফ, দক্ষিণে পাটওয়ারীকে এনসিপির মেয়রপ্রার্থী ঘোষণা
পশ্চিমবঙ্গে ২৫২ মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ
ইয়ামালের জোড়া গোল,বার্সার পাঁচে পাঁচ
আল-আরাফাহ ব্যাংকের ৪ পরিচালককে পদত্যাগের নির্দেশ
হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে নিহত ৫০০ ইয়েমেনি সেনা
আ.লীগের দুর্নীতি নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই: আসিফ