Sobar Desh | সবার দেশ ড. লিপন মুস্তাফিজ


প্রকাশিত: ০১:৪৭, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

আপডেট: ০১:৪৮, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

ব্যাংকে পদোন্নতি কেনো থেমে যায়

ব্যাংকে পদোন্নতি কেনো থেমে যায়
ছবি: সবার দেশ

ব্যাংকিং খাত একসময় ছিলো স্থিতিশীল ক্যারিয়ার, নিয়মিত পদোন্নতি আর নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা আছেন যারা একই পদে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন—যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও। প্রশ্নটা তাই খুব স্বাভাবিক: ব্যাংকে পদোন্নতি কেন থেমে যায়?

প্রথমে একটি সহজ সত্য স্বীকার করতে হয়—পদোন্নতি কখনোই শুধু সময়ের বিষয় নয়। এটি কর্মদক্ষতা, সুযোগ, কাঠামো এবং নীতির সমন্বিত ফল। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এ চারটি উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত মূল্যায়ন ব্যবস্থায়। কাগজে-কলমে বার্ষিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন বা ACR (Annual Confidential Report) আছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এর অনেকটাই ব্যক্তিনির্ভর। কে কেমন কাজ করলো তার চেয়ে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়—কে কার কাছের, কার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই পিছিয়ে পড়েন, আবার তুলনামূলক কম দক্ষ কেউ এগিয়ে যান। এ অস্বচ্ছতা পুরো ব্যবস্থার উপর আস্থা কমিয়ে দেয়।

এর সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি বাস্তবতা—পদের সীমাবদ্ধতা। ব্যাংকের উচ্চপদগুলোতে শূন্যপদ খুবই সীমিত। একটি শাখায় বা একটি জোনে নির্দিষ্ট সংখ্যক ম্যানেজার, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার বা জেনারেল ম্যানেজারের পদ থাকে। ফলে উপরের স্তর ‘জ্যাম’ হয়ে গেলে নিচের স্তরের পদোন্নতির পথও বন্ধ হয়ে যায়। একজন কর্মকর্তা তখন আটকে যান এক অদৃশ্য সারিতে, যেখানে অপেক্ষার কোনও নির্দিষ্ট শেষ নেই।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষতার পরিবর্তনশীল চাহিদা। আধুনিক ব্যাংকিং এখন আর শুধু লেজার বই বা ক্যাশ কাউন্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অটোমেশন এবং ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ—সবকিছুই নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কর্মীদের একটি বড় অংশ এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না। ফলে দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা পদোন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে শুধু কাঠামো বা দক্ষতা নয়, ব্যাংকিং খাতে একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী বাস্তবতা হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সম্পর্ক, প্রভাব বা “নেটওয়ার্কিং” গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি সত্য হোক বা না হোক, এ ধারণাটাই একটি বড় সমস্যা। কারণ এতে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার উপর আস্থা কমে যায়, এবং কর্মীরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত মনে করতে শুরু করেন।

অন্যদিকে আর্থিক চাপও একটি বড় কারণ। ব্যাংকগুলোর ওপর খেলাপি ঋণের বোঝা, মূলধন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চাপ দিন দিন বাড়ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই নতুন পদ সৃষ্টি বা দ্রুত পদোন্নতি দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেয়। বিশেষ করে যখন লাভজনকতা চাপের মুখে থাকে, তখন মানবসম্পদ উন্নয়ন অনেক সময় দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হয়ে যায়।

তবে দায় একতরফা নয়। কর্মীদের মধ্যেও একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়—শুধু সময়ের ওপর নির্ভর করা। অর্থাৎ ‘বছর পার হলেই পদোন্নতি হবে’—এমন ধারণা এখনও অনেকের মধ্যে কাজ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে শুধু সময় নয়, দক্ষতা, উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নিজের কাজকে সামনে আনার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন <<>> নববর্ষের অর্থনীতি: সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার এক অনন্য সংমিশ্রণ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দৃশ্যমানতা। অনেক দক্ষ কর্মকর্তা আছেন যারা নিঃশব্দে ভালো কাজ করেন, কিন্তু তা যথাযথভাবে উপস্থাপন করেন না। অন্যদিকে যারা নিজেদের কাজকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেন, তারা তুলনামূলক দ্রুত এগিয়ে যান। এ বাস্তবতা ভালো না লাগলেও, কর্পোরেট দুনিয়ায় এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তাহলে সমাধান কোথায়?

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য করতে হবে। ব্যক্তিগত মতামতের জায়গায় নির্দিষ্ট সূচক বা KPI ভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, পদোন্নতির জন্য একটি স্পষ্ট সময়ভিত্তিক ও যোগ্যতাভিত্তিক কাঠামো থাকা দরকার, যাতে অযথা দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি না হয়। তৃতীয়ত, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে, বিশেষ করে ডিজিটাল স্কিলের ক্ষেত্রে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতার পরিবর্তন—প্রতিষ্ঠান এবং কর্মী উভয়েরই। প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, আর কর্মীদের বুঝতে হবে যে পদোন্নতি শুধু অধিকার নয়, এটি অর্জনের বিষয়।

এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে পদোন্নতির স্থবিরতার আরেকটি গভীর কিন্তু কম আলোচিত কারণ হলো মানবসম্পদ পরিকল্পনার দুর্বলতা। অনেক প্রতিষ্ঠানেই দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার প্ল্যানিং সঠিকভাবে করা হয় না। কোন স্তরে কতজন কর্মকর্তা প্রয়োজন হবে, আগামী ৫–১০ বছরে নেতৃত্বের শূন্যতা কোথায় তৈরি হবে—এ ধরনের পূর্বাভাসভিত্তিক পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে হঠাৎ করে উপরের স্তরে পদ খালি না হওয়া এবং নিচের স্তরে অতিরিক্ত চাপ—এ দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। এ ভারসাম্যহীনতার ফলে ‘Career Stagnation’ একটি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়। একজন কর্মকর্তা যখন দেখেন যে তার সামনে অগ্রগতির বাস্তব সুযোগ সীমিত, তখন তার মধ্যে কর্মপ্রেরণা ধীরে ধীরে কমে আসে। এটি শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মপরিবেশকেও প্রভাবিত করে। একটি অনুপ্রেরণাহীন কর্মীবাহিনী কখনোই উচ্চমানের সেবা নিশ্চিত করতে পারে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহিতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতির সিদ্ধান্তের পেছনে যে মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, তা স্পষ্টভাবে ডকুমেন্টেড বা ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। ফলে একজন কর্মী বুঝতেই পারেন না কেন তিনি পিছিয়ে পড়লেন। এ অনিশ্চয়তা একটি ‘Trust Deficit’ তৈরি করে, যা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

এছাড়া সিনিয়রিটি বনাম মেরিট—এ দ্বন্দ্বও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি বড় জটিলতা। অনেক ব্যাংকে এখনও সিনিয়রিটি ভিত্তিক পদোন্নতির প্রবণতা বিদ্যমান। এর ফলে অপেক্ষাকৃত তরুণ কিন্তু দক্ষ কর্মীরা পিছিয়ে পড়েন, আর তুলনামূলকভাবে কম উদ্ভাবনী কিন্তু দীর্ঘদিন চাকরিতে থাকা কর্মকর্তারা এগিয়ে যান। যদিও সিনিয়রিটির একটি যৌক্তিক গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু একে যদি সম্পূর্ণভাবে প্রাধান্য দেয়া হয়, তাহলে উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ কমে যায়।

অন্যদিকে বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, অনেক উন্নত দেশে পদোন্নতি ব্যবস্থা অনেক বেশি Performance-Driven এবং Transparent। সেখানে নির্দিষ্ট KPI, নিয়মিত Skill Assessment এবং 360-Degree Feedback সিস্টেম চালু আছে। ফলে কর্মীরা শুরু থেকেই জানেন—কোন দক্ষতা অর্জন করলে তারা পরবর্তী স্তরে যেতে পারবেন। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের কাঠামো এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আরেকটি দিক হলো মানসিক চাপ ও কর্মজীবন ভারসাম্য। দীর্ঘদিন একই পদে আটকে থাকার ফলে অনেক কর্মীর মধ্যে ‘Burnout’ তৈরি হয়। একই ধরনের কাজ, সীমিত অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। এটি শুধু ব্যক্তি নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতাকেও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এ বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়—ব্যাংকিং খাত কি কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নাকি এটি একটি মানবসম্পদনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক খাত? যদি এটি সত্যিই জ্ঞানভিত্তিক খাত হয়, তাহলে কর্মীদের দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং ক্যারিয়ার গ্রোথকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

সমাধানের পথ তাই একক কোনও পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সমন্বিত সংস্কার প্রক্রিয়া। প্রথমত, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও ডেটা-নির্ভর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে প্রতিটি সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকে। তৃতীয়ত, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পুনঃদক্ষতা অর্জনের (Reskilling) ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করতে হবে যাতে ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়।

সবশেষে বলা যায়, ব্যাংকে পদোন্নতির স্থবিরতা কোনও বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়—এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। এ সংস্কৃতি পরিবর্তন করা যত দ্রুত সম্ভব জরুরি। কারণ একটি দেশের ব্যাংকিং খাত শুধু অর্থনীতির চাকা নয়, বরং পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর আস্থা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি। এ ভিত্তি দুর্বল হলে তার প্রভাব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।  ব্যাংকে পদোন্নতির স্থবিরতা শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়—এটি একটি আস্থার সংকট। এ সংকট যদি দূর না হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার উপর পড়বে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংকার

সম্পর্কিত বিষয়:

শীর্ষ সংবাদ:

যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ ২ বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর একজনের লাশ উদ্ধার
সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জঙ্গি হামলার শঙ্কা
সেন্টমার্টিন রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে
প্রয়োজনে সংসদ-রাজপথ একাকার হয়ে যাবে: নাহিদ ইসলাম
নেত্রকোনায় জামায়াত এমপির গাড়িতে হামলা
‘প্রধানমন্ত্রী ও তার কন্যাকে নিয়ে আমি কিছুই লিখিনি’
ক্যান্সার ধরা পড়েছিলো—স্বীকার করলেন নেতানিয়াহু
‘শহীদদের সঙ্গে ‘গাদ্দারি’ করলে ধুলোয় মিশে যাবে’
আজীবন সম্মাননায় নায়ক আলমগীর
বৈশ্বিক বাজারে নতুন শক্তি মুসলিম নারীদের পোশাক
গণভোট বাস্তবায়নে তিন মাসের কর্মসূচি খেলাফত মজলিসের
শার্শায় ভুল প্রশ্নে এসএসসি পরীক্ষা, বিপাকে ১২ শিক্ষার্থী!
ইরানি জনগণের ঐক্য শত্রুপক্ষকে দুর্বল করেছে: মোজতবা খামেনি
এনসিপিতে যোগ দিলেন ইসহাক, রনি, কাফিসহ চারজন
১৭ বছর বিদেশে কারা ‘গুপ্ত’ ছিলো—প্রশ্ন জামায়াত নেতার
জুলাই সনদে ‘প্রতারণার ছাপ’: আইনমন্ত্রী
‘সন্তান জন্ম দিতে যুক্তরাষ্ট্রে আসে’,—ট্রাম্পের বক্তব্য রুচিহীন: ভারত
কলেজশিক্ষিকাকে জুতাপেটা করার পেছনের বিস্ফোরক তথ্য