ঢাকায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার
২০৩০ সালে শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির সম্ভাবনা বাংলাদেশের
বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। রাজধানীতে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির একটি হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
সম্মেলনে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষকদের আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাবনা উঠে আসে। বক্তারা বলেন, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
মাইকেল মিলার বলেন, এলডিসি উত্তরণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশকে শুধু দাতা-গ্রহীতা সম্পর্কের মধ্যে না রেখে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে ইইউ। এমনকি এলডিসি উত্তরণ সম্পন্ন না করা কোনও দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে নিয়ে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে ইইউ। একই সঙ্গে একটি উন্মুক্ত, স্থিতিশীল ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজনীতি ও নীতিপ্রণয়নে বৈশ্বিক মানদণ্ড বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সম্মেলনে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বর্তমানে দেশটির ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য এই সুবিধা পাচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের পর তিন বছরের রূপান্তরকালেও বিদ্যমান সুবিধা বহাল থাকবে এবং পরবর্তীতে পোশাকসহ সিংহভাগ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বলে জানান তিনি।
সারাহ কুক বলেন, যুক্তরাজ্য এখন উন্নয়ন সহায়তা নির্ভর সম্পর্কের পরিবর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে আধুনিক কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নিয়েও সম্মেলনে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন বলে জানানো হয়। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। এসব কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির তালিকায় বাংলাদেশের স্থান পাওয়া বাস্তবসম্মত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনের মূল্যায়ন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। একই সময়ে দেশটি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল তিনটি অর্থনীতির একটি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের আরেক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধারা বজায় থাকলে ২০৩০ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার প্রায় ৬৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সময়ে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো উদীয়মান অর্থনীতিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাংলাদেশের সামনে বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সবার দেশ/কেএম




























