নতুন পে-স্কেল নিয়ে দুঃসংবাদ, বাড়ছে না ভাতা
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ হয়েছে। তবে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের প্রস্তুতি চললেও আপাতত বাড়ছে না বিভিন্ন ধরনের ভাতা। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, গত ৩০ জুন যে হারে ভাতা দেয়া হয়েছে, আপাতত সে হারেই ভাতা পাবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন বাড়লেও ভাতার ক্ষেত্রে এখনই বাড়তি অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের জন্য আইবাস ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদের কাজ চলছে। নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের বর্ধিত বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভাতা আগের হারেই বহাল রাখার সিদ্ধান্তে বাড়তি আর্থিক সুবিধার প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না অনেকের।
এ সিদ্ধান্তের আওতায় রয়েছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর, দফতর ও সংস্থার কর্মচারীরা। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাও এর অন্তর্ভুক্ত।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগের মধ্যে ভাতা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, দৈনন্দিন ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতার ওপরও নির্ভর করেন অনেক কর্মচারী। ফলে মূল বেতন বাড়লেও ভাতার হার অপরিবর্তিত থাকলে তাদের মোট আর্থিক সুবিধা প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।
তবে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, কার্যকর তদারকি এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ। তবে বেতন বাড়লেই দুর্নীতি কমবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, যারা দুর্নীতি করেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে, যারা দুর্নীতিতে জড়িত নন, তারা বেতন বাড়ানোর কারণে দুর্নীতিতে জড়াবেন, এমন ধারণারও ভিত্তি নেই।
সাবেক এ সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি, জবাবদিহি এবং শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ ছাড়া শুধু আর্থিক সুবিধা বাড়িয়ে সরকারি সেবার মান উন্নয়ন বা দুর্নীতি কমানোর প্রত্যাশা পূরণ নাও হতে পারে।
অন্যদিকে, নতুন বেতনকাঠামোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, নতুন বেতনকাঠামোর প্রভাব কী হবে, তা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ, এর প্রভাব সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমানভাবে পড়বে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম। তার হিসাবে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা দুই থেকে তিন লাখের মতো, যেখানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি।
তৌফিক আহমেদ চৌধুরীর মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর ফলে অর্থের সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে শুধু এ কারণে অর্থের সরবরাহ এতটা বেড়ে যাবে যে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, বিষয়টি এমন নয়। তার বক্তব্য, মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন বেতনকাঠামোর প্রভাব যতটা হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাস্তবে তা ততটা নাও হতে পারে।
তিনি মনে করেন, নতুন বেতনকাঠামোর প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে। এ কারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। বেতনকাঠামোর পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন খাতে আয়, ব্যয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এ কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতনে পরিবর্তন আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বেতনকাঠামোর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, সরকারি ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর। একই সঙ্গে ভাতা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত কত দিন বহাল থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে কোনও পরিবর্তন আনা হবে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে সরকারি কর্মচারীদের।
সবার দেশ/কেএম




























