১৫ বছরেও হয়নি কুলকিনারা
কাঁটাতারে ঝুলছে ফেলানী হত্যার বিচার
আজ ৭ জানুয়ারি। সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। ২০১১ সালের এ দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সদস্যের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায় ফেলানী।
হত্যার পর প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে ছিলো তার নিথর লাশ। সে ভয়াবহ দৃশ্য বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করলেও দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও আজও মেলেনি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার।
ফেলানীর বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামে। জীবিকার তাগিদে তার বাবা নূরুল ইসলাম পরিবারসহ বসবাস করতেন ভারতের আসাম রাজ্যের বঙ্গাইগাঁও এলাকায়। বড় মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হওয়ায় ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করেন তারা।
সেদিন ভোর ৬টার দিকে ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে মই ব্যবহার করে কাঁটাতার পার হন নূরুল ইসলাম। পরে ফেলানী কাঁটাতার টপকানোর সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে বিদ্ধ হয় সে। গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ছটফট করার পর ঘটনাস্থলেই মারা যায় ফেলানী। সকাল পৌনে ৭টা থেকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা তার লাশ সীমান্তের কাঁটাতারেই ঝুলে থাকে, যা প্রত্যক্ষ করে স্থানীয় মানুষ ও সীমান্তবাসীরা।
এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত সরকার ও বিএসএফ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। ওই মামলায় সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও মামা হানিফ।
তবে একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর বিএসএফের বিশেষ আদালত অভিযুক্ত সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দেন। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে ফেলানীর পরিবার পুনর্বিচারের আবেদন জানায়। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু হয় এবং ১৭ নভেম্বর ফের সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। কিন্তু ২০১৫ সালের ২ জুলাই দ্বিতীয় দফাতেও অমিয় ঘোষ খালাস পান।
এরপর ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহায়তায় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলামের পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। একই বছরের ৬ অক্টোবর শুনানি শুরু হলেও ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে একাধিকবার তা পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য থাকলেও করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে সেটিও হয়নি। এরপর থেকে মামলাটির কোনো অগ্রগতির খবর পাননি ফেলানীর পরিবার।
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম আজও বুকভরা ক্ষোভ ও কান্না নিয়ে বলেন, বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আমার মেয়েকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে। দুই দেশের সীমান্তে কত রক্ত ঝরেছে। ১৫ বছর হয়ে গেলো, কিন্তু আমরা এখনও বিচার পেলাম না। আজও সে বিচারের আশায় আছি।
হতাশ কণ্ঠে ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, ফেলানী হত্যার ১৪ বছর পেরিয়ে ১৫ বছরে পড়লো, কিন্তু বিচার পেলাম না। সুপ্রিম কোর্টে মামলা নেয়া হলেও কয়েকবার শুনানির তারিখ দিয়ে তা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন আর কোনো খবরই পাই না। আমার মেয়ের বিচার হলে সীমান্তে মানুষ মরার ঘটনা কমে যেতো। মরার আগে যেন মেয়ের বিচার দেখে যেতে পারি—এ দাবি জানাই।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফেলানী হত্যার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার এবং ক্ষতিপূরণ দাবিতে ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। এতে ভারতের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং বিএসএফ মহাপরিচালককে বিবাদী করা হয়। পরে ২০১৫ সালের ২১ জুলাই ফেলানীর বাবার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণের আবেদনও করা হয়।
কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, ভারতের আন্তরিকতার অভাবেই ফেলানী হত্যার বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি। এ বিচার হলে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড অনেকাংশে কমে আসতো। বিচার ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত নিষ্পত্তি করা ভারতের নৈতিক দায়িত্ব।
দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও কাঁটাতারে ঝুলে থাকা সে লাশের স্মৃতি যেমন মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়, তেমনি ঝুলে থাকা বিচার আজও ফেলানীর পরিবার ও সীমান্তবাসীর কাছে এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে আছে।
সবার দেশ/কেএম




























