মধ্যপ্রাচ্যে ‘তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা’ নীতি ত্যাগ করছে যুক্তরাষ্ট্র!
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের ‘তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা’ নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে অঞ্চলটির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার আগ্রহও কমছে ওয়াশিংটনের। তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই দেশটির। বরং দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ অঞ্চলে নিজেদের ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে টম ব্যারাক বলেন, অঞ্চলটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি এখন আর ওয়াশিংটনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি সরে না গিয়ে কীভাবে সেখানে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখা যায়, সেটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনার বিষয়।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে ওয়াশিংটন। এত দিন জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার যুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিনিময়ে এসব দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে দেশটি। এ সম্পর্ককেই সাধারণভাবে ‘তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা’ নীতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
তবে আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা এ নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দোহায় অনুষ্ঠিত ফোরামে টম ব্যারাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে আলোচনা করছে না। বরং এ অঞ্চল ছেড়ে না গিয়ে সেখানে কীভাবে অবস্থান বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে ভাবছে ওয়াশিংটন।
তার এ বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নতুন ধরনের কৌশল গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এ পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা কিংবা আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, বিভিন্ন দেশের সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে হস্তক্ষেপ নিয়ে দেশটির নীতির সমালোচনাও রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন টম ব্যারাক।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শুরু করেছে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানে সব সময় ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়—এ উপলব্ধি এখন ওই দেশগুলোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে।
ব্যারাকের মতে, কোনও দেশের সরকার বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র যখনই হস্তক্ষেপ করেছে, তখনই অনেক ক্ষেত্রে সে সিদ্ধান্তের ভুল পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ, বাইরে থেকে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর প্রচেষ্টা সব সময় প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা ও নতুন সংকটের পথ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের কাছে এ বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে, সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে স্থানীয় দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্ব কমে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের কারণে অঞ্চলটি এখনও ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সামরিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ফলে ‘তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা’ নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান, আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক কৌশলের ওপর।
টম ব্যারাকের বক্তব্যে আপাতত যে বার্তাটি উঠে এসেছে, তা হলো—মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা কিংবা অন্য দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রচেষ্টার পরিবর্তে অঞ্চলটিতে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার নতুন পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ কৌশল বাস্তবায়নে ওয়াশিংটন কতটা সফল হবে, তা নির্ধারিত হবে আগামী দিনের আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও দেশটির নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
সবার দেশ/এফও




























