খরচে কাঁপছে পেন্টাগন
ইরানে হামলা করে বিপদে যুক্তরাষ্ট্র, টমাহক মিসাইল সংকট
জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক হ্যারিসন কাস পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। মাত্র তিন দিনে যে পরিমাণ টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, তা পূরণ করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ইরানের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ প্রাথমিকভাবে কৌশলগত সাফল্য পেলেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীকে। যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টায় প্রায় ৪০০টি টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল নিক্ষেপের পর এখন পেন্টাগন এক গভীর মজুদ সংকটে পড়েছে বলে দাবি সামরিক বিশ্লেষকদের। এ পরিস্থিতিকে তারা বলছেন ‘এম্প্টি র্যাক’ বা রিক্ত ভাণ্ডার সংকট।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে এ উচ্চমাত্রার ব্যয় ভবিষ্যতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের সময় এ ঘাটতি বড় ধরনের কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক হ্যারিসন কাস পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, মাত্র তিন দিনে যে পরিমাণ টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, বর্তমান উৎপাদন হারে তা পূরণ করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ১৩টি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিন থেকে পরিচালিত হামলায় নৌবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ১০ শতাংশ নিঃশেষ হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, আনুষ্ঠানিকভাবে BGM-109 Tomahawk, দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নৌবাহিনীর নির্ভরযোগ্য দূরপাল্লার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি নিচু দিয়ে উড়ে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এবং শত্রুর রাডার, কমান্ড সেন্টার বা কৌশলগত স্থাপনা নিখুঁতভাবে আঘাত করতে পারে। তবে এ অস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর উৎপাদন প্রক্রিয়া ধীরগতির।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বছরে মাত্র ৭২ থেকে ৯০টি টমাহক তৈরি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ অপারেশনের প্রথম ১২ ঘণ্টাতেই শত শত স্ট্রাইক পরিচালিত হয়েছে। একটি মিসাইল তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে এবং এর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের সরবরাহ নির্ভর করে অল্প কয়েকটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ওপর। ফলে সরবরাহ চেইনে চাপ তৈরি হলে উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হয় না।
তুলনামূলকভাবে ২০০৩ সালে Operation Iraqi Freedom চলাকালে প্রায় ৮০০টি টমাহক ব্যবহার করা হয়েছিলো। তবে সে সময়ের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে উন্নত সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (IADS) ভেদ করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি মিসাইল প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে এ ব্যয় যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। চীন যদি এ সুযোগে তাইওয়ান ঘিরে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে মার্কিন নৌবাহিনী দ্রুত মজুদ সংকটে পড়তে পারে।
এ প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপরও। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো সম্প্রতি টমাহক কেনার চুক্তি করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যদি জরুরি মজুদ ধরে রাখতে হিমশিম খায়, তাহলে সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে তাৎক্ষণিক সামরিক সাফল্য অর্জনের বিনিময়ে এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামরিক জয় যদি ভবিষ্যৎ সংঘাতে সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত কৌশলগত পরাজয়ে রূপ নিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: নাইনটিন ফোরটি ফাইভ
সবার দেশ/কেএম




























