যুগে যুগে বহুরূপী ইহুদি এজেন্ট!
বেনগাজির রহস্যময় ‘আবু হাফস’—ইমাম থেকে গুপ্তচর?
লিবিয়ার বেনগাজি শহরকে ঘিরে কয়েক বছর ধরে একটি রহস্যময় ঘটনার গল্প মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানে দাবি করা হয়, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এক ব্যক্তি পরে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য হিসেবে ধরা পড়েন। তবে ই ঘটনার অনেক তথ্যই স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
২০১১ সালে লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর দেশজুড়ে ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সে সময় বেনগাজিতে ‘আবু হাফস’ নামে এক অজানা ব্যক্তি এসে বসবাস শুরু করেন—এমন দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কথিত আছে, তিনি নিজেকে কুরআনের হাফিজ এবং বহু হাদিস জানা একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচয় দিতেন। সাবলীল আরবি ভাষা ও ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করেন। পরোপকারী আচরণ ও ধর্মীয় পরামর্শের কারণে অনেকেই তাকে একজন ধার্মিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
স্থানীয়দের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় তিনি বেনগাজির একটি বড় মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পান বলেও দাবি করা হয়। ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরামর্শ দেয়ার কারণে তার প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। গাদ্দাফি-পরবর্তী বিশৃঙ্খলার সময় অনেকের কাছে তিনি শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তবে পরবর্তী সময়ে তার পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তিনি গোপনে লিবিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের জন্য সদস্য সংগ্রহ ও সংগঠন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছিলেন। কথিত আছে, তার নেতৃত্বে প্রায় দুই শতাধিক সদস্যের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যা স্থানীয়ভাবে ‘আবু হাফস গ্রুপ’ নামে পরিচিত ছিলো।
এ গ্রুপ লিবিয়ার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলেও হামলা পরিচালনা করতো—এমন অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে এসব তথ্যের অনেকটাই যাচাই করা কঠিন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
২০১৭ সালে লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ‘আবু হাফস’ নামে পরিচিত ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে—এমন দাবি কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। স্পেনের সংবাদপত্র El País–এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তে তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসে।
ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তার আসল নাম বেনজামিন এফ্রাইম এবং তিনি একজন ইসরায়েলি নাগরিক। আরও বলা হয়, তিনি ইসরায়েলের বিশেষ গোপন ইউনিট ‘মুস্তা’রাবিম’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হয়। এ ইউনিট আরব সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের নিয়ে কাজ করে।
কিছু প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, তিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য সংগ্রহ ও গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এ বিষয়ে লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ থেকেও স্পষ্ট কোনো সরকারি বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তাকে কোন বাহিনী গ্রেফতার করেছিলো—সেটিও পরিষ্কার নয়। পরে তার কী হয়েছে, সে সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসেনি।
আরব ও মুসলিম দেশের সরকারে মন্ত্রী এমপি সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা, এমনকি শায়খ আলেম দাঈ, সমাজ ও মানবাধিকারকর্মী রূপেও বিজাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি ঘাপটি মেরে থাকে। বিদেশি শক্তির নির্দেশে রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে তাদের চলাচলের অবাধ সুযোগ অবারিত থাকে। স্থানীয় ও জাতির সামনে পরিচিত ব্যক্তি ও সংগঠনকে পেছনে রেখে এসব বিজাতীয় এজেন্সির লোকজনকে নানাভাবে প্রমোট করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে অনেক ঘটনার মতো এ ঘটনাটিও রহস্যে ঘেরা থেকে গেছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও পাল্টা দাবি থাকলেও পুরো ঘটনা এখনও পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সবার দেশ/কেএম




























