কৌশল বদলের মুখে ওয়াশিংটন–তেলআবিব
ইরানের ‘ব্যয় চাপিয়ে দেয়া’ খেলায় ধরাশায়ী ট্রাম্প-নেতানিয়াহু
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিলো দ্রুত ও তীব্র আঘাতের মাধ্যমে তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে চাপে ফেলা। পরিকল্পনা ছিলো—‘শক অ্যান্ড অ’ ধাঁচের আকস্মিক হামলায় ক্ষমতার কেন্দ্রকে অস্থিতিশীল করে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ উসকে দেয়া, যাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
কিন্তু কয়েক দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনও দৃশ্যমান লক্ষণ নেই। বরং তেহরান দ্রুত সামরিক পুনর্গঠন করে পাল্টা হামলা শুরু করেছে এবং সংঘাতকে আঞ্চলিক মাত্রায় বিস্তৃত করেছে। ফলে প্রাথমিক কৌশল যে প্রত্যাশিত ফল দেয়নি, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একদিকে বলেছেন, এটি ‘অন্তহীন যুদ্ধ নয়’; অন্যদিকে স্বীকার করেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এ দ্বৈত অবস্থান আসলে ওয়াশিংটনের ভেতরের দোটানার প্রতিফলন—দ্রুত সাফল্যের রাজনৈতিক চাপ বনাম বাস্তব সামরিক জটিলতা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করাই এখন অগ্রাধিকার। এতে বোঝা যাচ্ছে, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থেকে কিছুটা সরে এসে সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের দিকে জোর দেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযান সঠিক পথে রয়েছে বলে আশ্বস্ত করলেও বাস্তবতা বলছে—ইরানকে দ্রুত কোণঠাসা করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের কৌশল: সরাসরি সংঘর্ষ নয়, ‘কস্ট-ডিস্ট্রিবিউশন’
শুরুর বড় আকারের পাল্টা হামলার পর ইরান এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকেরা একে বলছেন ‘কস্ট-ডিস্ট্রিবিউশন’—অর্থাৎ প্রতিপক্ষের ওপর সরাসরি সামরিক ধাক্কা না দিয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যয় বাড়িয়ে দেয়া।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সামান্য অস্থিরতাও জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি করছে।
তেহরানের লক্ষ্য স্পষ্ট—ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তিকে সরাসরি মোকাবিলা না করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি করা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের জন্য সংবেদনশীল ইস্যু হওয়ায়, এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়তে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব দেশ একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের অংশ, অন্যদিকে তারা সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী—ফলে আঞ্চলিক ভারসাম্য আরও নড়বড়ে হচ্ছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর সঙ্গে উপসাগরীয় নেতাদের যোগাযোগ এ সংকটে নতুন কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কৌশলগত জোট পুনর্বিন্যাসের দিকেও এগোচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার প্রশ্ন
খবর এসেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি ইরানের ভেতরে বিকল্প চাপ তৈরির ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার করেছে এবং প্রাথমিক ধাক্কার পর দ্রুত নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির কৌশল নতুন নয়, কিন্তু তা কতটা কার্যকর হবে—তা অনিশ্চিত। বরং এতে তুরস্ক ও ইরাকের মতো দেশ জড়িয়ে পড়লে সংঘাত আরও জটিল হতে পারে।
সহ্যক্ষমতার লড়াই
এ যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়; এটি সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা। কে কতোদিন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বহন করতে পারে—সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ইরান সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, যাতে প্রতিপক্ষের ব্যয় বাড়তে থাকে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কৌশলগত সাফল্য দেখাতে চায়, যাতে আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান অটুট থাকে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: চীনের ছায়া
এ সংঘাতের পেছনে আরও বড় কৌশলগত হিসাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ব্যবহার, আঞ্চলিক ঘাঁটির ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা—সবই অন্যান্য পরাশক্তির নজরে।
প্রশ্ন উঠছে—ভবিষ্যতে যদি চীন একই ধরনের ‘ব্যয় চাপিয়ে দেয়ার’ কৌশল গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সামাল দিতে পারবে?
মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জোটরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























