মজুত স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে তিন বছরের বেশি
ইরান যুদ্ধের চাপে টান মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রভান্ডারে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান হারে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে শুধু ইরান নয়, ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন সামরিক বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় অস্ত্রভান্ডার ফিরিয়ে আনতে তিন বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতির সমাপ্তির পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা জোরদার করায় অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার হামলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত অস্ত্রের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, বর্তমান গতিতে যুদ্ধ চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার এমন পর্যায়ে নেমে যেতে পারে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল ও'হানলনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কাঙ্ক্ষিত মাত্রার তুলনায় ইতোমধ্যেই অনেক কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। তবে একই সময়ে সেই পরিমাণ নতুন অস্ত্র উৎপাদন বা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সিএসআইএসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সাময়িকভাবে থামার আগ পর্যন্ত পেন্টাগন তাদের থাড (THAAD) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তত অর্ধেক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছিলো। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যবহার হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র পুনরায় উৎপাদনের গতি অত্যন্ত ধীর। চলতি অর্থবছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি মাসে মাত্র ১৫টি টমাহক এবং প্রায় ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। অন্যদিকে ২০২৭ সালের আগে নতুন কোনও থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সম্ভাবনাও নেই।
পেন্টাগনের সাবেক ডেপুটি ও ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার এবং বর্তমানে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এলেন ম্যাককাস্কার বলেন, অধিকাংশ উন্নত অস্ত্র পুনরায় মজুত করতে দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এদিকে নতুন অস্ত্র উৎপাদনের জন্য অর্থায়ন নিয়েও চাপের মুখে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। অবসরপ্রাপ্ত দুই তারকা জেনারেল জন ফেরারি দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপনের জন্য কংগ্রেস এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনও বরাদ্দ অনুমোদন করেনি।
তবে পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট প্রয়োগ করা হয়েছে এবং উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া জার্মানি ও ইউক্রেনের মতো দেশকে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লাইসেন্স দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর চাপ কিছুটা কমানো যায়। ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে ঘোষণা দেন।
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কারখানা নির্মাণ বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, জাপানে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা নির্মাণে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছিলো। একইভাবে ২০২২ সালে উৎপাদন লাইন স্থাপনের কাজ শুরু করলেও জার্মানি এখনো একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রও উৎপাদন করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যুদ্ধবিরতির সময় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিলো। কিন্তু নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় সে চাপ আবারও বেড়েছে। ফলে বর্তমান যুদ্ধের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত থাকবে, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























