ভারতের উদ্দেশে জামায়াত আমিরের প্রশ্ন:
‘বন্ধু হলে বাংলাদেশের কিলারকে আশ্রয় দিয়েছেন কেনো?’
ভারতকে বাংলাদেশের ‘বড় বন্ধু’ দাবি করার পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত যদি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু হয়ে থাকে, তাহলে দেশের ‘বড় কিলারকে’ কেন সেখানে জায়গা দেয়া হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর ইস্কাটনে শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান—ন্যায়বিচার, মেধার মূল্যায়ন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক ৩৬ জুলাই উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পাশের দেশ দাবি করে তারা আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু। তাহলে বড় বন্ধু হলে বাংলাদেশের বড় কিলারকে আপনারা বুকে জায়গা দিয়েছেন কেনো? শুধু জায়গা দেননি, আপনারা কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং দুই রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমরা তার নিন্দা জানাই।
তিনি বলেন,
কাজ করবেন শত্রুর, গালভরা বলবেন আমি বন্ধু—বাংলাদেশের মানুষ এত বোকা না।
শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, একটি সমাজে অপরাধীরা ভয়াবহ পরিণতি থেকে বাঁচতে পালিয়ে যায়। এখন পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতারা উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছেন এবং মাঝেমধ্যে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, যে মানুষ প্রতিদিন বলে, আমি আত্মহত্যা করবো—সে জীবনেও আত্মহত্যা করে না। আর যে বীর যুদ্ধের ময়দানে লড়ে যায়, সে বলে না যে আমি একজন বীর যোদ্ধা। বরং জাতি বলে, সে বীর যোদ্ধা। এতো সাহস, তাহলে গেলেন কেনো?
শেখ হাসিনার ভারত যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তার ভাব এমন যে, আমি মক্কা যেতে চেয়েছিলাম, নিয়ে গেছে মস্কোয়। এখন তিনি বলেন, কই আমি তো গোপালগঞ্জ যেতে চেয়েছিলাম, এখানে কেনো নিয়ে এসেছে।
তিনি আরও বলেন,
অথচ এখন সবকিছু বের হয়ে আসছে। তিন দিন পাশের দেশে একাধিক ফোন গেছে। তাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। তাহলে কি গোপালগঞ্জ যেতে ভারতের কাছে ফোন দিয়েছিলেন নাকি? জাতির সঙ্গে এ তামাশা তারা আর দেখতেও চায় না, শুনতেও চায় না।
জুলাই আন্দোলন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের ফ্যাসিবাদীদের বিদায় করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদে আক্রান্তরাও বিদায় নিয়েছেন। এখন নতুন করে কোনও ফ্যাসিবাদ দেখতে চায় না দেশের মানুষ।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ একটা ভাইরাস। এটা কোনও ব্যক্তি নয়, ব্যক্তির গায়ে বসে। এ ভাইরাস যাকেই পাবে, তাকে ফ্যাসিবাদী বানিয়ে ছাড়বে।
কোনও ব্যক্তি বা দল একই ধরনের দমনমূলক কর্মকাণ্ড করলে তাদেরও ফ্যাসিবাদী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যে সমস্ত কাজ-অপকর্ম করার কারণে ওই সরকারকে ফ্যাসিবাদী বলছি, আজকেও যদি একই কাজ করেন, নিঃসন্দেহে তারাও ফ্যাসিবাদ। যে কাজ অন্যের সন্তান করলে সন্ত্রাসী বলবো, সে কাজ আমার সন্তান করলে তাকেও বলতে হবে সন্ত্রাসী।
জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সব ধরনের ভেদাভেদ ও বৈষম্য দূর করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনই ছিলো এ আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের হিসাবে এ আন্দোলনে ১৪ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, শ্রমিক এবং আলেম-ওলামারাও এতে অংশ নিয়েছিলেন। নিহতদের মধ্যে ৬ থেকে ৭ শতাধিক সাধারণ শ্রমিক ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বর্তমান সরকারের মেধাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশে আসার আগে ও পরে বহুবার মেধাতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কোথায়, তা দেখা যাচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করেন, সৎ, মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা যারা দেশের মানুষের সেবা করতে চান, তাদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় তাদের পোস্টিং দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ প্রতিশোধ কার বিরুদ্ধে? তারা জাতিকে উপযুক্ত সেবা দিতে না পারলে আপনাদের প্রতিশোধ হবে জাতির বিরুদ্ধে।
সংসদে বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এখন যারা সরকারি দলে, বিরোধী দলে আছি সবাই তো মজলুম ছিলাম। তাহলে মজলুমরা এখন আবার জালিম হতে যাচ্ছে কেন? মজলুম যখন জালিম হয়, তখন আগের জালিমের চেয়ে তার পরিণতি আরও ভয়ানক হয়।
ক্ষমতায় থাকা কোনো দল বা ব্যক্তিকে অহংকারে না ভোগার সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তন যেকোনও সময় হতে পারে। যারা একসময় ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের কেউ আজ সংসদে নেই—তাদের অপকর্মের কারণেই তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি করেছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, শহীদদের মর্যাদা রক্ষায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন জরুরি। নতুন বাংলাদেশে বৈষম্য ও অন্যায়ের কোনো জায়গা থাকা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের সাহসিকতা অনুকরণীয় এবং এনডিএফ জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে ন্যায়ভিত্তিক, মেধানির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এনডিএফ মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির ও সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুলসহ অনেকে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্য, গবেষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
এ সময় চিকিৎসা, নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজি, স্বাস্থ্য সাংবাদিকতা, রক্তসেবা, মানবিক সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেয়া হয়।
সবার দেশ/কেএম




























