এক পোর্টালেই মিলবে ট্রেড লাইসেন্স: বাণিজ্যমন্ত্রী
ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ব্যবস্থায় ঘরে বসেই আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রচলিত ট্রেড লাইসেন্সের পরিবর্তে ‘বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট’ চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও হয়রানি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়ন সহজ করা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের পরিবর্তে যৌথ পরিদর্শন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ‘ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স অন ডিরেগুলেশন অ্যান্ড বিজনেস ফ্যাসিলিটেশন’-এর প্রথম সভায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সভায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার উদ্যোগ এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
ট্রেড লাইসেন্স প্রদান ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনভেদে পৃথক ব্যবস্থায় ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত অনলাইন পোর্টালের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থা চালু হলে ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারবেন। সেখানেই আবেদন ও নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে ঘরে বসে লাইসেন্স সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বিভিন্ন দফতরে যাতায়াত, সময়ক্ষেপণ ও প্রশাসনিক জটিলতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রচলিত ট্রেড লাইসেন্সকে ‘বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট’ বা সমজাতীয় নামে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের সময়সীমা ও বিস্তারিত পদ্ধতি সভায় জানানো হয়নি।
বিদেশি কর্মীদের অনুমোদন সহজ করার উদ্যোগ
বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের বিদ্যমান প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তার মতে, এ প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, বিদেশি নাগরিকেরা বাংলাদেশে বিভিন্ন বৈধ ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করতে আসেন। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর পরিশোধ করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকেরাও দেশের বৈধ নাগরিক। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়ে আবেদন এবং প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন দেয়ার পরও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক জটিলতা সৃষ্টি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
একই দিনে হবে একাধিক সংস্থার পরিদর্শন
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বারবার পরিদর্শনের কারণে সময় ও অর্থ ব্যয় এবং ভোগান্তি কমাতেও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর নেতৃত্বে সমন্বিত পরিদর্শন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিদর্শন পৃথক সময়ে না করে একই দিনে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত তারিখে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে যৌথভাবে পরিদর্শন করা হবে। এতে একই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সংস্থার বারবার যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক হয়রানি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সভায় জানানো হয়, ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন, পারমিট ও লাইসেন্স প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমে দ্বৈততা দূর করতে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব খাতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খাতেও এ উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবা সহজ করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান, অর্থ বিভাগের সচিব, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদফতরের নিবন্ধক এবং অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।
সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুমোদন ও পরিদর্শন পর্যন্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একাধিক ধাপে সময় ও ব্যয় কমতে পারে। তবে একক অনলাইন পোর্টাল, দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স এবং যৌথ পরিদর্শন ব্যবস্থা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় ও বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
সবার দেশ/কেএম




























