Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:০৮, ৭ অক্টোবর ২০২৬

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস

এআইনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে দক্ষিণ এশিয়া: বিশ্বব্যাংক

এআইনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে দক্ষিণ এশিয়া: বিশ্বব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানা ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থাকলেও তুলনামূলকভাবে স্থিতিস্থাপক অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর ভর করে চলতি বছর এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আপডেট’ প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং এআই গ্রহণের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়লেও উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অঞ্চলটি এখনো অনেক পিছিয়ে। ফলে সঠিক নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এআইকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হলো শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানা ধরনের ধাক্কা ও অনিশ্চয়তা থাকলেও অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা অঞ্চলটির অর্থনীতিকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।

তবে সামনে বেশ কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানির উচ্চমূল্য দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে চাপ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিও কৃষি, খাদ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

এআইকে নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্বজুড়ে দ্রুত এআই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এর ব্যবহার এখনো সীমিত। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকির পাশাপাশি দ্রুত এআই গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বড় সুযোগও রয়েছে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সামনে।

তবে এআইয়ের সুফল পেতে শুধু প্রযুক্তি আমদানি করলেই হবে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এর জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, শক্তিশালী ভৌত অবকাঠামো ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নও জরুরি।

এআইনির্ভর অর্থনীতির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে কর্মসংস্থানের ধরনও বদলে যেতে পারে। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে অনেক শ্রমিক ও কর্মী পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন। অন্যদিকে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মীদের প্রস্তুত করা গেলে এআই নতুন ধরনের কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে এআই ব্যবহারের আওতায় আনার ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ব্যবসাগুলো যাতে সহজে এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে, সে জন্য বিদ্যমান বাধা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে এআইভিত্তিক উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নে উৎসাহ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

এআই ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরিরও পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা কমবে। পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও সহজ হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের এ মূল্যায়ন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণের মূল বার্তা হলো, এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি দ্রুত এআই গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অবকাঠামো ও নীতিগত সক্ষমতা তৈরি করতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনকে শুধু ঝুঁকি হিসেবে নয়, নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো সম্ভব।

সবার দেশ/কেএম