গ্যাস আমদানিনির্ভরতা কমাতে কতটা ভূমিকা রাখবে তিতাসের নতুন দুই কূপ?
দৈনিক ৩ কোটি ঘনফুট বাড়তি উৎপাদনে জ্বালানি নিরাপত্তায় সম্ভাবনা, তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের অবদান সীমিত। তিতাসের নতুন দুই কূপ গ্যাস সংকটের সমাধান নয়, তবে আমদানিনির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন নিঃসন্দেহে।
দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগামী ১০ বছরে উত্তোলিত গ্যাসের সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি কূপ খননের উদ্যোগ ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহে বাড়তি সক্ষমতা তৈরি করবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের চাপ কিছুটা কমাতে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দেশের সামগ্রিক গ্যাস চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতার তুলনায় এ উৎপাদন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, উৎপাদনের স্থায়িত্ব এবং গ্যাসের সুষ্ঠু বণ্টনের ওপর।
এলএনজি আমদানির চাপ কমানোর সম্ভাবনা
বাংলাদেশের গ্যাস চাহিদা ও দেশীয় উৎপাদনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ওঠানামা, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ দেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিতাসের নতুন দুটি কূপ থেকে দৈনিক ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে বছরে প্রায় ১ হাজার ৯৫ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এ গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গেলে সমপরিমাণ গ্যাস আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমানো যাবে। ফলে এলএনজি কেনার ব্যয়, আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ উৎপাদন দিয়ে দেশের সামগ্রিক গ্যাস ঘাটতি দূর করা সম্ভব নয়। বরং এটি বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক একটি অতিরিক্ত উৎস হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ইতিবাচক প্রভাব
দেশের তৈরি পোশাকশিল্প, বস্ত্র, সিরামিক, সার, ইস্পাত ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে।
তিতাসের নতুন কূপ থেকে পাওয়া গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ থাকবে। একইভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা মিলতে পারে। এতে ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কিছুটা কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে নতুন গ্যাসের বরাদ্দ কোন খাতে কীভাবে দেয়া হবে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন বাড়লেও যদি গ্যাসের বণ্টন ব্যবস্থায় সমন্বয় না থাকে, তাহলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত প্রত্যাশিত সুফল নাও পেতে পারে।
১০ বছরে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে উৎপাদিত গ্যাসের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি ৬০ হাজার ব্যারেলের বেশি কনডেনসেট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কনডেনসেট দেশের জ্বালানি ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদা পূরণে বাড়তি অবদান রাখতে পারে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এলএনজি আমদানি ব্যয় সাশ্রয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা হ্রাস।
তবে প্রকল্পটির প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ নির্ধারণে কূপ খনন, অবকাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদন ব্যয় এবং কূপের সম্ভাব্য উৎপাদন হ্রাসের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাস্তবায়নে সময় ও কারিগরি দক্ষতার চ্যালেঞ্জ
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে একটি কূপ থেকে এবং দেড় বছরের মধ্যে দুটি কূপ থেকেই গ্যাস উত্তোলন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কূপ খনন একটি জটিল ও ব্যয়বহুল কারিগরি প্রক্রিয়া। ভূতাত্ত্বিক অবস্থা, খনন সরঞ্জামের প্রাপ্যতা, রিগ স্থাপন, প্রকৌশলগত প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন অনুমোদনের ওপর প্রকল্পের সময়সীমা নির্ভর করবে।
এ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে অযথা বিলম্ব হলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পিছিয়ে যাবে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কূপ খনন নিশ্চিত করা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কূপ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সে উৎপাদন ধরে রাখা যাবে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাসক্ষেত্রের চাপ ও উৎপাদনক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
শুধু নতুন কূপ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় শুধু নতুন কূপ খনন যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখা, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং গ্যাসের অপচয় ও সিস্টেম লস কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং শিল্পকারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। গ্যাসের সীমিত মজুতকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার কাজে ব্যবহার করতে হলে খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে সমাধান নয়
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি কূপ খননের উদ্যোগকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। দৈনিক ৩ কোটি ঘনফুট বাড়তি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট নিরসনে এ ধরনের বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি সমন্বিত অনুসন্ধান, উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় কার্যকর অবদান রাখবে।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য কয়েকটি তুলনা গুরুত্বপূর্ণ।
- তিতাস প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব
- দৈনিক বাড়তি গ্যাস (MMCFD) ৩০
- প্রকল্প ব্যয় (কোটি টাকা) ৫৯২
- দৈনিক আমদানিকৃত এলএনজি (MMCFD), সাম্প্রতিক পরিকল্পনাগত হিসাব ১,১০০
- দৈনিক প্রকৃত গ্যাস চাহিদা (MMCFD) ৩,৮০০
তিনটি বিষয় বিশেষভাবে সরকারের বিবেচনায় নেয়া উচিত:
- দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট ধরে হিসাব করলে নতুন ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট হবে মোট সরবরাহের প্রায় ১.১ শতাংশ। অর্থাৎ এটি সহায়ক, কিন্তু বড় ধরনের ঘাটতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
- প্রকল্পের ১০ বছরের সম্ভাব্য উৎপাদনের ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। কিন্তু গ্যাস কোম্পানির বিদ্যমান কূপমুখী মূল্য অনুযায়ী গ্যাস ও কনডেনসেটের সম্মিলিত মূল্য মাত্র ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এ দুটি হিসাবের পার্থক্য সংবাদে পরিষ্কার করা জরুরি।
- সরকারের ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। তিতাসের দুটি কূপ সে বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ। পুরো কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ অনেক বেশি।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য ডেইলি স্টার ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।
লেখক ও সংবাদকর্মী




























