Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:১৩, ১৫ আগস্ট ২০২৬

সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে লম্বা লাইন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও উৎপাদন

গ্যাস বাড়িতেও নেই, গাড়িতেও নেই: সারা দেশে তীব্র সংকটে হাহাকার

গ্যাস বাড়িতেও নেই, গাড়িতেও নেই: সারা দেশে তীব্র সংকটে হাহাকার
ছবি: সবার দেশ

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা; বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা; শিল্পকারখানায় কমছে উৎপাদন—তীব্র গ্যাস সংকটে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নাজেহাল হয়ে পড়েছে জনজীবন। গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ সংকটে সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের দিনের বড় একটি অংশ কাটছে ফিলিং স্টেশনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক চালক দুই ট্রিপও দিতে পারছেন না। কোথাও কোথাও সরবরাহ এতটাই কম যে ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে একদিকে পরিবহণ সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে চালকদের আয় কমে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

শুধু গাড়িতে নয়, বাসাবাড়িতেও গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দিনের বেশির ভাগ সময় অনেক এলাকায় চুলা জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে মানুষ এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেকট্রিক বা ইনডাকশন চুলার দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ রান্না না করে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও গ্যাসের স্বল্পচাপের প্রভাব পড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সব মিলিয়ে গ্যাসের সংকট এখন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

মিরপুরে সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

মিরপুরের গাবতলী, কল্যাণপুর, কালশী, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকায় শুক্রবার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সরবরাহ কম থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও অটোরিকশার চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

গাবতলীর মোহনা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকার চালক খলিল বলেন, গ্যাসের সংকট আগের তুলনায় আরও বেড়েছে। গভীর রাতে সামান্য গ্যাস পাওয়া গেলেও দিনের বেলায় পরিস্থিতি খুবই খারাপ।

তিনি বলেন, প্রায় দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস পেয়েছেন। কিন্তু সে গ্যাস দিয়ে মাত্র দুটি ট্রিপ দিতে পেরেছেন। এরপর আবার গ্যাস নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে।

খলিল বলেন, ‘আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই।’

ডেমরায় চার ঘণ্টারও বেশি অপেক্ষা

ডেমরার বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। গ্যাস নিতে অনেক চালককে চার ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রতিটি চালু স্টেশনের সামনে দেখা গেছে গাড়ির দীর্ঘ লাইন।

গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় যাত্রী পরিবহণের সময় কমে যাচ্ছে। এতে চালকদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেকে দূরপাল্লার যাত্রী নিতে পারছেন না।

রাসেল ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনে রেন্ট-এ-কার চালক মো. বশির হাওলাদার বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে। দূরের যাত্রী পেলেও তাদের নিয়ে যাওয়ার পর আবার গ্যাসের জন্য কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়।

তিনি বলেন, 

যাত্রী গাড়িতে রেখে এখন আর গ্যাস নেয়া যায় না। কারণ ৩-৫ ঘণ্টা লাইনে থাকতে হচ্ছে। আর এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরিবারের সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে।

অন্যদিকে গ্যাস বিক্রি কমে যাওয়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোর মালিকদেরও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

সকাল ৯টায় লাইনে, দুপুরেও সিরিয়াল নেই

মুগদা, মানিকনগর, সবুজবাগ, খিলগাঁও, বনশ্রী ও হাজীপাড়া এলাকায়ও গ্যাসের চাপ ছিলো অত্যন্ত কম। অনেক ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে।

শান্ত ফিলিং স্টেশনে লাইনে থাকা চালক কবির হোসেন বলেন, সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তার সিরিয়াল আসেনি।

তিনি বলেন, দিন যত যাচ্ছে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। গ্যাস না পেলেও মালিককে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে কী করবো বুঝতে পারছি না।

উত্তরায় অধিকাংশ স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ

রাজধানীর উত্তরা এলাকাতেও গ্যাস সংকট ছিলো তীব্র। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ ছিলো। যেসব স্টেশন চালু ছিলো, সেগুলোতেও স্বল্পচাপের কারণে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিলো না। ফলে স্টেশনগুলোর সামনে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট ও গাড়ির সারি।

খন্দকার ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক কামাল আহমেদ বলেন, রাজধানীর পরিবহণের বড় একটি অংশ সিএনজির ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের করার মতো তেমন কিছু নেই।

সিএনজিচালক জসিম বলেন, তিনি রাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু এখনও গ্যাস পাননি।

তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালাবো কীভাবে? সামনে বাচ্চাদের স্কুলের বেতন দেবো কীভাবে? এত মানসিক চাপ আর নিতে পারছি না।

বাসাবাড়িতেও চুলা জ্বলছে না

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বাসাবাড়ির রান্নাঘরে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের পর দিন স্বাভাবিক চাপের গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চুলায় আগুন জ্বলছে না।

উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, সাধারণত ভোরে গ্যাস থাকলে সারা দিনের রান্না করে রাখা যায়। কিন্তু গত তিন দিন ধরে গ্যাসের সরবরাহ প্রায় নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।

স্কুলশিক্ষিকা আমেনা বেগম বলেন, গ্যাস না থাকায় তাদের স্কুলের ডে-কেয়ারে শিশুদের জন্য রান্না করা যাচ্ছে না। ফলে হোটেল থেকে খাবার কিনে শিশুদের দিতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিকল্প হিসেবে এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করতে চাইলেও সেটিও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে সেগুলো কেনাও অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু পরিবহণ ও আবাসিক খাতে সীমাবদ্ধ নেই। শিল্পকারখানাগুলোতেও গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন কমিয়ে আনতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও কার্যক্রম বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরাও বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গ্যাস সংকটের এ পরিস্থিতিতে একদিকে পরিবহণ খাতের চালকরা আয় হারাচ্ছেন, অন্যদিকে বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য মানুষকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

সব মিলিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পরিবহণ, রান্নাবান্না, শিল্প উৎপাদন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবার দেশ/কেএম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:

উত্তরায় পেট্রোল পাম্পে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেফতার ৫
জাতীয় প্রেসক্লাবে জমকালো কাওয়ালী সন্ধ্যা
সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেয়াও কঠিন হয়ে যাবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত: রণধীর জয়সোয়াল
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেবো না: নাহিদ
হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফর নয়
সিরাজদিখানে জমির শাহানা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
গ্যাস বাড়িতেও নেই, গাড়িতেও নেই: সারা দেশে তীব্র সংকটে হাহাকার
গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
বহু বছর পর যোগ্য রাষ্ট্রপতি পাচ্ছে দেশ: আসিফ নজরুল
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ২৬ আগস্ট
দিন গোনা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই: বিদ্যুৎমন্ত্রী
রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায় যুক্ত ঢাবির ৯২ শিক্ষক
হাসিনার প্রত্যর্পণ ঠিক না হলে তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না: নাহিদ ইসলাম
মার্কিন রণতরীতে নাবিকদের আত্মহত্যাচেষ্টার হিড়িক
টেস্ট ইতিহাসের সেরা দিন পার করলো বাংলাদেশ