প্রবন্ধ
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
সুখ কী? কোথায় তার ঠিকানা? ধন-সম্পদের পাহাড়ে, অট্টালিকার ঝলমলে বারান্দায়, নাকি প্রিয়জনের মুখে ফুটে ওঠা এক চিলতে হাসিতে? সুখ কি কেবল নিজের ভালো থাকার নাম, নাকি চারপাশের মানুষগুলোকে ভালো থাকতে দেখার মধ্যেই তার প্রকৃত পরিপূর্ণতা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে জীবনের অলিগলিতে আমাদের বারবার থমকে দাঁড়াতে হয়।
করোনাকালের ঘটনা। এ দেশের এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ীকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, স্যার, আপনি কেমন আছেন? সদ্য কোভিড-১৯ থেকে আরোগ্য লাভ করা মানুষটি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলেছিলেন, ভালো নেই। আমি সুখী নই।
কেনো তিনি সুখী নন—এমন প্রশ্নের উত্তরে উঠে এসেছিলো করোনামুক্তির পরও বয়ে বেড়ানো নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতার কথা। আশ্চর্যের বিষয়, বিপুল আর্থিক ক্ষতির প্রসঙ্গটি একবারও তার মুখে আসেনি। যেনো মুহূর্তেই জীবনের হিসাবের খাতা থেকে টাকা-পয়সার অঙ্কগুলো মুছে গিয়ে সেখানে বড় হয়ে উঠেছিলো সুস্থ শরীর আর প্রশান্ত মনের মূল্য।
কয়েক মাস পর তাকে আবারও একই প্রশ্ন করা হলো। এবার তার কণ্ঠে স্বস্তি, চোখেমুখে প্রশান্তি—আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। সুস্থ আছি। সুখে আছি।
জীবনের এ ছোট্ট অথচ গভীর অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অর্থবিত্ত মানুষকে সচ্ছলতা দিতে পারে, কিন্তু সুখের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালান্স কিংবা অঢেল সম্পদ নয়, কখনও কখনও নির্বিঘ্নে নিঃশ্বাস নেয়া, সুস্থ শরীরে প্রিয়জনের পাশে বসা আর নিশ্চিন্তে একটি রাত ঘুমিয়ে কাটানোই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
হৃদয়ের ভেতর অন্যের সুখ
প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া একটি প্রিয় গান যেন সুখের সংজ্ঞাকে আরও গভীর করে তোলে। গানটির কথায় উঠে এসেছে এক অসুস্থ হৃদয়ের আকুতি, যেখানে নিজের জীবন-মৃত্যুর চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে হৃদয়ে বসবাস করা এক রূপসী মেয়ের নিরাপত্তা।
ও ডাক্তার!\
আপনি যখন করবেন আমার ওপেন হার্ট সার্জারি,\
দেখবেন হার্টের মাঝখানে একটা মেয়ে রূপসী ভারি,\
ছুরি কাঁচি সুঁইয়ের খোঁচা তার যেন না লাগে,\
আমার বাঁচা মরা পরে,\
তার জীবনটা আগে গো ডাক্তার,\
ও ডাক্তার...
এ কণ্ঠে শুধু একজন হৃদ্রোগীর আর্তি নেই; আছে ভালোবাসার এক অনন্য দর্শন। নিজের হৃদয়ে ছুরি চলুক, নিজের জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ুক—তবু প্রিয় মানুষটির গায়ে যেনো আঁচড়টুকুও না লাগে! নিজের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকেও যিনি অন্যের নিরাপত্তার কাছে সমর্পণ করতে পারেন, তার কাছে সুখ নিশ্চয়ই একান্ত ব্যক্তিগত কোনও অর্জন নয়।
কুমার বিশ্বজিতের এ গানের আবেগ আমাদের শেখায়, মানুষ কখনও কখনও নিজের সুখকে খুঁজে পায় অন্যের ভালো থাকার মধ্যে। প্রিয় মানুষটি সুস্থ থাকুক, নিরাপদে থাকুক, তার মুখে হাসি ফুটুক—এ কামনাই তখন নিজের বেঁচে থাকার প্রেরণা হয়ে ওঠে। নিজের সুখের সীমানা পেরিয়ে অন্যের জীবনে আলো ছড়িয়ে দেয়ার নামই হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
সুখের নামে অসুখের সাম্রাজ্য
অথচ আমাদের সমাজে এর বিপরীত ছবিটিও কম ভয়াবহ নয়। কোথাও অন্যায়, কোথাও অবিচার, কোথাও দুর্নীতি; কোথাও মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ার উন্মত্ত প্রতিযোগিতা। কারও কারও কাছে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়াই যেনো জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা। সে সম্পদের জন্য ন্যায়-অন্যায়, বিবেক-বিবেচনা, এমনকি মানুষের জীবনও যখন তুচ্ছ হয়ে পড়ে, তখন প্রশ্ন জাগে—এ কেমন সুখ, যার ভিত্তি অন্যের অশ্রু?
যে সুখের প্রাসাদ গড়ে ওঠে অন্যের দীর্ঘশ্বাসের ওপর, তার দেয়াল যতই উঁচু হোক, ভিত কি আদৌ মজবুত হয়? অন্যের অধিকার পদদলিত করে অর্জিত সম্পদ একদিন নিজের কাছেই বোঝা হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আর বিত্তের যে অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়, সময়ের নির্মম পরিহাসে সে অহংকারই একদিন ধুলায় মিশে যেতে পারে।
তখন হয়তো মনে পড়ে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের কবি জ্ঞানদাসের সে বেদনাবিধুর পঙ্ক্তি—
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু\
অনলে পুড়িয়া গেল।
সুখের আশায় যে ঘর নির্মাণ, সে ঘরই যদি আগুনে পুড়ে ছাই হয়, তবে এত আয়োজনের অর্থ কী? যে সম্পদকে মানুষ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভাবে, তা-ই যদি অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে প্রাপ্তির খাতায় শেষ পর্যন্ত কী থাকে?
তবে পৃথিবী কেবল লোভ আর আত্মকেন্দ্রিকতার গল্পে ভরা নয়। এ অন্ধকারের মধ্যেও কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজেদের প্রাপ্তির চেয়ে অন্যের প্রয়োজনকে বড় করে দেখেন। নিজেদের সামর্থ্য, শ্রম, সম্পদ—এমনকি জীবনের মূল্যবান সময়টুকুও তারা ব্যয় করেন মানুষের কল্যাণে। তাদের আনন্দের উৎস বিলাসে নয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যে। তাদের কাছে পরের উপকার কোনও দায় নয়, আত্মার পরিতৃপ্তি। এ মানুষগুলোই প্রমাণ করেন, সব সুখের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
আমার সুখ, আমার অসুখ
আমিও কখনও কখনও নিজেকে সুখী মানুষ বলে মনে করি। বলি, আমি সুস্থ আছি, তাই সুখী। ছোট্ট একটি সাজানো সংসার আছে। ছেলে-মেয়ে আছে, মা আছেন, ভাই-বোন আছেন। আলহামদুলিল্লাহ, সবাই সুস্থ আছে। মাথার ওপর ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট আছে, সৎপথে সংসার চালানোর মতো আয় আছে। পদ-পদবি, বাড়ি-গাড়ি কিংবা আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষার মোহ আমাকে তেমন টানে না। মনে হয়, জীবনের চাহিদা যখন সীমিত, প্রাপ্তিগুলো যখন ভালোবাসায় পূর্ণ, তখন আর কী চাই?
নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি কি তবে সত্যিই মহাসুখী?
উত্তরটা এতো সহজ নয়।
আমাদের পরিবারের পোষা বিড়াল টাফি কয়েক মাস আগে এক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলো। ছোট্ট প্রাণীটির অসুস্থতা আমাদের পুরো পরিবারকে কী ভীষণ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো, চিকিৎসার চেষ্টা, অনিশ্চয়তার দীর্ঘ প্রহর—সব মিলিয়ে টাফিকে সুস্থ করে তোলার লড়াইয়ে আমাদের দিন কেটেছে দুশ্চিন্তায়।
দীর্ঘ কয়েক মাসের চিকিৎসার পর টাফি এখন সুস্থ। তার স্বাভাবিক চলাফেরা, পরিচিত দুষ্টুমি আর চেনা উপস্থিতি আমাদের ঘরে ফিরিয়ে এনেছে স্বস্তি। ছোট্ট এই প্রাণটির সুস্থ হয়ে ওঠাই আমাদের কাছে বড় আনন্দ, বড় প্রাপ্তি। এখন আমাকে সুখী বলতেই পারেন।
কিন্তু এখানেও যেনো সুখের হিসাব শেষ হয় না।
নিজের সংসারে শান্তি থাকলেই কি মানুষ নিশ্চিন্তে সুখী হতে পারে? নিজের প্রিয়জনেরা ভালো থাকলেই কি চারপাশের পৃথিবীর প্রতি সব দায় শেষ হয়ে যায়? যদি তা-ই হতো, তবে ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে আমাদের এত মানুষের বুকের ভেতর উদ্বেগের ঝড় উঠেছিলো কেন?
আমাদের সবার সন্তান তো রাজপথে আন্দোলন করতে যায়নি। সবার সন্তান তো গুলিবিদ্ধ হয়নি, প্রাণ হারায়নি। সবাই তো অন্যায়ভাবে কারাবন্দী হয়নি, সবাইকে তো ক্ষমতার রোষানলে পড়ে নিপীড়নের শিকার হতে হয়নি। তবু এত মানুষের চোখে ঘুম ছিলো না কেনো? এত মানুষের মনে অজানা আশঙ্কা, এত মানুষের বুকে চাপা কষ্ট জমেছিলো কেনো?
কারণ, মানুষের হৃদয় কেবল নিজের পরিবারের জন্য স্পন্দিত হয় না। অন্যের সন্তান যেন গুলিতে ঝাঁঝরা না হয়, কোনও নিরপরাধ মানুষ যেনো বিনা বিচারে শাস্তি না পায়, কোনও পরিবার যেন প্রিয়জন হারিয়ে নিঃস্ব না হয়—এ আকাঙ্ক্ষাও আমাদের সুখ-দুঃখের অংশ হয়ে ওঠে।
আমরা চেয়েছি, দেশে শান্তি থাকুক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকুক। বাজারদর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকুক। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হোক। কোনও মা যেনো সন্তান হারানোর শোকে পাথর না হয়ে যান, কোনও পরিবার যেনো অন্যায়ের ভারে ভেঙে না পড়ে।
নিজের ঘরে আলো জ্বললেও পাশের ঘরে আগুন লাগলে কি নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়? নিজের সন্তান নিরাপদে থাকলেও অন্যের সন্তান রক্তাক্ত হলে কি বুকের ভেতর কোনো হাহাকার জাগে না?
জাগে। আর সে হাহাকারই বলে দেয়, মানুষ কেবল নিজের সুখের জন্য বাঁচে না।
দেশের সীমানা পেরিয়ে মানবতার ডাক
তবু কি দেশের মানুষ ভালো থাকলেই সুখের সবটুকু পূর্ণ হয়? দেশ শান্তিতে থাকলেই কি হৃদয়ের সব জানালা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে বসে থাকা যায়? সম্ভবত না।
ফিলিস্তিনে যখন নিরীহ মানুষের ওপর নেমে আসে হত্যাযজ্ঞ, নারী-শিশুর আর্তনাদে যখন ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস, তখন দূরদেশের মানুষের চোখেও পানি আসে কেন? ঢাকার রাজপথে প্রতিবাদের মিছিল হয় কেনো? ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সংবাদ আমাদের উদ্বিগ্ন করে কেনো? ভারত, আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের নির্বাচন নিয়েও কেনো আমাদের মনে কৌতূহল, উৎকণ্ঠা কিংবা প্রত্যাশার জন্ম হয়?
কারণ,
মানুষের বিবেকের কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নেই। মানবিকতার মানচিত্রে কাঁটাতারের বেড়া নেই। মানুষের দুঃখ যখন আমাদের স্পর্শ করে, তখন দেশ, জাতি কিংবা ভাষার দূরত্ব অনেকটাই মুছে যায়। অন্যের কান্না আমাদের চোখ ভিজিয়ে দেয়, অন্যের বিপর্যয় আমাদের স্বস্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
সুখ তাই কেবল ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের নাম নয়; সুখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ন্যায়বিচার, মানবিকতা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং অন্যের ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা। নিজের চারপাশের মানুষগুলো ভালো থাকুক—এ চাওয়া যখন নিজের সুখের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে, তখনই মানুষ তার ব্যক্তিগত গণ্ডি অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিকতার অংশ হয়ে যায়।
সুখের চিরন্তন সংজ্ঞা
সুখ আপেক্ষিক। কারও কাছে সুখ মানে প্রাচুর্য, কারও কাছে শান্তি। কেউ সুখ খুঁজে পান অর্জনে, কেউ ত্যাগে। কারও সুখ নিজের স্বপ্ন পূরণে, কারও সুখ অন্যের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখায়। ব্যক্তিভেদে সুখের সংজ্ঞা বদলায়, বদলায় তার মাত্রা ও প্রকাশভঙ্গি। কিন্তু ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মধ্যে যে গভীর তৃপ্তি, তা যুগে যুগে মানুষের বিবেককে আলোড়িত করেছে।
বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কবি কামিনী রায়ের ‘সুখ’ কবিতায় এ মানবিক দর্শনই যেনো পেয়েছে এক চিরন্তন ভাষা। কবি আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতার সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি যেনো প্রশ্ন করে—শুধু নিজের সুখের হিসাব কষেই কি মানুষের জীবন পূর্ণ হয়? অন্যের দুঃখে যার হৃদয় কাঁদে না, অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যার হাত বাড়ে না, সে কি সত্যিই সুখের অর্থ বুঝতে পেরেছে?
কবি বলেন—
নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?—\
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?\
যতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে\
কেবলি কি নর জনম লয়?—\
কার্যক্ষেত্র ওই প্রশস্ত পড়িয়া,\
সমর-অঙ্গন সংসার এই,\
যাও বীরবেশে কর গিয়ে রণ ;\
যে জিনিবে সুখ লভিবে সেই।\
পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি\
এ জীবন মন সকলি দাও,\
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?\
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।\
পরের কারণে মরণের সুখ ;\
“সুখ” “সুখ” করি কেঁদনা আর,\
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,\
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।\
সকলের মুখ হাসি-ভরা দেখে\
পারনা মুছিতে নয়ন-ধার?\
পরহিত-ব্রতে পারনা রাখিতে\
চাপিয়া আপন বিষাদ-ভার?\
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে\
আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে,\
সকলের তরে সকলে আমরা,\
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
কবিতার এ আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সুখের সন্ধানে মানুষ যত দূরেই যাক, অন্যের প্রতি তার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনও পথ নেই। নিজের দুঃখে ডুবে থেকে নয়, বরং অন্যের দুঃখ লাঘবের চেষ্টায় মানুষ অনেক সময় নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পায়। নিজের জন্য বাঁচা সহজ; অন্যের জন্য বাঁচতে প্রয়োজন সাহস, মমতা ও আত্মত্যাগ।
শেষ পর্যন্ত সুখের ঘর আমরা সবাই বাঁধতে চাই। কেউ ইট-পাথরে, কেউ সম্পদে, কেউ ক্ষমতায়, কেউ ভালোবাসায়। কিন্তু সে ঘরের ভিত্তি যদি কেবল নিজের স্বার্থের ওপর দাঁড়ায়, তবে সামান্য ঝড়েই তা ভেঙে পড়তে পারে। আর যে ঘরের ভিত্তি গড়ে ওঠে মানবিকতা, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা ও পরের কল্যাণে, সে ঘর হয়তো বিলাসবহুল নয়, কিন্তু তার ভেতর থাকে প্রশান্তির আলো।
সুখের জন্য ঘর বাঁধা দোষের নয়। দোষ তখনই, যখন নিজের ঘরের সুখ নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা অন্যের ঘরে আগুন জ্বালাই। কারণ, অন্যের কান্নার ওপর দাঁড়ানো সুখ কখনোই পূর্ণ সুখ হতে পারে না।
সুখের প্রকৃত অর্থ হয়তো এখানেই—আমি ভালো আছি, কিন্তু শুধু আমার ভালো থাকাই শেষ কথা নয়; আমার চারপাশের মানুষও ভালো থাকুক, আমার দেশ ভালো থাকুক, পৃথিবীর মানুষও নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচুক।
সবার মুখে হাসি ফুটলে, অন্যের অশ্রু মুছতে পারলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারলে—আমাদের নিজেদের সুখও তখন নতুন অর্থ খুঁজে পায়।
তাই সুখের লাগিয়া ঘর বাঁধি, তবে সে ঘর হোক সবার। সে ঘরের দরজা খোলা থাকুক মানুষের জন্য, তার জানালা দিয়ে ঢুকুক মানবিকতার আলো। সেখানে কারও কান্না যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায়, কারও বেদনা যেনো একান্ত তার নিজের বোঝা হয়ে না থাকে।
কারণ, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু সুখী হওয়া নয়—অন্যের সুখের কারণ হতে পারা।
লেখক ও সংবাদকর্মী




























