Sobar Desh | সবার দেশ অমৃতা ইশরাত


প্রকাশিত: ০১:৪১, ২ জুলাই ২০২৬

প্রবন্ধ

দৃষ্টির বাইরে যে আলো

দৃষ্টির বাইরে যে আলো
ছবি: সবার দেশ

যুদ্ধ নিয়ে লেখা অধিকাংশ উপন্যাসের একটা সহজ প্রবণতা থাকে—ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করতে চাওয়ার প্রবণতা। সৈন্য, অস্ত্র, জয়-পরাজয়, রাষ্ট্রের উত্থান-পতন, সব মিলিয়ে যুদ্ধ হয়ে ওঠে উপজীব্য। অ্যান্থনি ডোয়ারের 'অল দ্য লাইট উই ক্যাননট সি' সে প্রচলিত পথ ধরে হাঁটে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখানে কাহিনির পটভূমি হলেও উপন্যাসটির প্রকৃত বিষয় যুদ্ধ নয়; যুদ্ধের ভেতরে মানুষ কীভাবে তার ব্যক্তিগত পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে, সে সংগ্রাম। ডোয়ার ইতিহাসকে পাঠকের ওপর না চাপিয়ে মানুষের ক্ষুদ্র, আপাত তুচ্ছ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাঠ করেন।  উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, বৃহৎ ইতিহাসের চেয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিই শেষ পর্যন্ত অধিক স্থায়ী।

উপন্যাসের দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র মারি-লর ল্যব্লাঁ এবং ভের্নার ফেনিগ—দুটি ভিন্ন ভূগোল, দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা, দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি। মারি ছয় বছর বয়েসে দৃষ্টিশক্তি হারায়। তার বাবা প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরির তালা-কারিগর। মেয়েকে পৃথিবী চেনাতে তিনি প্যারিস শহরের একটি ক্ষুদ্র কাঠের প্রতিরূপ নির্মাণ করেন। মারি আঙুলের স্পর্শে সবকিছু চিনে নেয়। ডোয়ার এ অধ্যায়টি এমন সংযমে লিখেছেন যে এটা শুধু পিতৃস্নেহের ঘটনা না হয়ে; জ্ঞানের গভীর রূপকে ধরা দেয়। পৃথিবীকে দেখার জন্য চোখই একমাত্র উপকরণ নয়—এ সহজ সত্যটি উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই।

একই সময়ে জাদুঘরে রক্ষিত কিংবদন্তিতুল্য কাল্পনিক হীরে 'সি অব ফ্লেমস' যুদ্ধের আশঙ্কায় সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মারির বাবা সে হীরে—অথবা তার নিখুঁত প্রতিরূপগুলোর একটি নিয়ে প্যারিস ছাড়েন। ডোয়ার দীর্ঘ সময় ধরে পাঠককে নিশ্চিত হতে দেন না, কোনটি আসল হীরে আর কোনটি নকল। এ অনিশ্চয়তা শুধু রহস্য সৃষ্টির কৌশল নয়, যুদ্ধের সময় সত্যের ভঙ্গুরতাকেও প্রতিফলিত করে।

অন্যদিকে জার্মানির খনি-অঞ্চলের অনাথ কিশোর ভের্নার ফেনিগ রেডিও যন্ত্রের প্রতি অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করে। ভাঙা রেডিও খুলে সচল করবার সহজাত ক্ষমতা তাকে নাৎসি সামরিক বিদ্যালয় শুলপফোর্টায় পৌঁছে দেয়। পাঠক বুঝতে পারে প্রতিভা এখানে আশীর্বাদ নয়, রাষ্ট্রের হাতে সমরাস্ত্রে পরিণত হওয়ার সূচনা। যুদ্ধ ভের্নারের কাছ থেকে প্রথমে তার শৈশব, পরে স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। শত্রুপক্ষের গোপন রেডিও সম্প্রচার শনাক্ত করার কাজে নিযুক্ত হয়ে সে ক্রমশ বুঝতে শেখে, প্রযুক্তি একদিকে যেমন মানুষকে সংযুক্ত করে, অন্যদিকে নিপীড়নের যন্ত্রেও পরিনত করে।

জার্মান বাহিনী প্যারিস দখল করলে মারি ও তার বাবা আশ্রয় নেন সাঁ-মালো শহরে, চাচা এতিয়েন ল্যব্লাঁর বাড়িতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মানসিক আঘাতে ভেঙে পড়া এতিয়েন পরবর্তীকালে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং গোপনে রেডিও সম্প্রচার শুরু করেন। লক্ষ্য করবার মতো বিষয়, ডোয়ার তার দুই প্রধান চরিত্রকে রেডিওর মাধ্যমেই অদৃশ্যভাবে সংযুক্ত করেন। তারা একে অপরকে চেনে না, কখনও দেখেওনি, কিন্তু অদৃশ্য তরঙ্গের জগতে তাদের জীবন ইতোমধ্যেই পরস্পরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উপন্যাসের নামের গভীর অর্থও যেন এখানেই—চোখে দেখা যায় না আবার অস্তিত্বও অস্বীকার করা যায় না।

উপন্যাসের শেষাংশ, ১৯৪৪ সালের সাঁ-মালো অবরোধ, সমগ্র কাহিনির আবেগিক এবং নন্দনতাত্ত্বিক পরিণতি। গোলাবর্ষণে বিধ্বস্ত শহরের একটি চিলেকোঠায় লুকিয়ে থাকা মারি রেডিওতে সাহায্যের সংকেত পাঠায়। সে সংকেত শুনতে পায় ভের্নার। সে নিজের সামরিক দায়িত্ব অমান্য করে মারিকে উদ্ধার করে এবং 'সি অব ফ্লেমস' হীরের পেছনে উন্মত্ত নাৎসি কর্মকর্তা রাইনহোল্ড রুমপেলের হাত থেকে তাকে রক্ষা করে। তবে ডোয়ার তার উপন্যাসে কোনো রূপকথার সমাপ্তি লেখেন নি। তাই যুদ্ধ শেষ হলেও ভের্নারের মুক্তি মেলে না। যুদ্ধোত্তর সময়ে একটি পরিত্যক্ত স্থলমাইন বিস্ফোরণে তার মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে মারি বেঁচে থাকে, প্যারিসে ফিরে সমুদ্রজীববিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে, সংসার গড়ে। বহু বছর পরে ভের্নারের বোনের সাথে মারির দেখা হওয়া যেন উপন্যাসের শেষ মানবিক সেতুবন্ধন—যেখানে ইতিহাসের চেয়ে স্মৃতিই বেশি সত্য হয়ে ওঠে।

ডোয়ারের সবচেয়ে বড় শিল্পসাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, তিনি যুদ্ধকে বীরত্বের ভাষায় লেখেন না। তার আগ্রহ ধ্বংসের দৃশ্যে নয়, ধ্বংসের মধ্যেও টিকে থাকা মানুষের অনুভবে। একটি তালা, একটি কাঠের শহরের মডেল, একটি রেডিও, একটি ঝিনুক কিংবা একটি কাল্পনিক হীরে—এ ক্ষুদ্র বস্তুগুলো তার হাতে গভীর প্রতীকে পরিণত হয়। বিশেষ করে রেডিও এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় রূপক। যে তরঙ্গ চোখে দেখতে পাই  না, সে তরঙ্গই দূরের মানুষকে সংযুক্ত করে। তেমনি সহমর্মিতা, স্মৃতি কিংবা ভালোবাসাও দৃশ্যমান নয়, কিন্তু মানবসভ্যতার স্থায়ী শক্তি।

সম্ভবত এ কারণেই 'অল দ্য লাইট উই ক্যাননট সি' কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধভিত্তিক আরেকটি উপন্যাস নয়, ইতিহাসের বৃহৎ আখ্যানের ভেতর ব্যক্তিমানুষের ক্ষুদ্র অথচ অপরিহার্য বোধকে গভীর করে তোলে।

লেখক: ব্যাংকার

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

নারীসহ যুবদল নেতা আটক, হারালেন পদ
‘ফুয়েল আপ–সেলিব্রেশন অব টেস্ট’-এর যাত্রা শুরু
এইচএসসিতে প্রথম দিনে অনুপস্থিত প্রায় ২৫ হাজার, বহিষ্কার ৭
শার্শায় তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে দুই যুবক গ্রেফতার
নোয়াখালীতে হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং
যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত ইরান, বসেনি বৈঠকে
জুলাই অভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি না থাকায় জামায়াতের ক্ষোভ
তিন সাবেক গভর্নরের নথি তলব দুদকের
খামেনি হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা ইরানের, দোষীদের শাস্তির হুঁশিয়ারি
কেইনের জোড়া গোলে শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ড
ইকুয়েডরকে উড়িয়ে ৮ বছর পর শেষ ষোলোয় মেক্সিকো
হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর: কারাগারে ছয় আসামি
পুলিশের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবসরে