প্যাকেটজাত খাবারে সতর্কবার্তা, দেশজুড়ে প্রচারণা শুরু
অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয় সহজে শনাক্ত করতে মোড়কের সামনে সতর্কবার্তা সংবলিত লেবেল ব্যবহারের বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে দেশব্যাপী প্রচারণা শুরু হয়েছে। এ ধরনের লেবেল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা, ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে উৎসাহিত করা এবং এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগে জনসমর্থন জোগানো এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে গণমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান), ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট, কোয়ালিশন ফর হেলদি ফুড এবং সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি এফেয়ার্স (সিএলপিএ) যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
আয়োজকেরা জানান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য অসংক্রামক রোগ দায়ী। হৃদরোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস এসব রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ স্থূলতায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
এ পরিস্থিতিতে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশে সতর্কবার্তা সংবলিত লেবেল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের লেবেলকে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল বলা হয়। এর মাধ্যমে কোনও খাবার বা পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি, লবণ কিংবা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে কি না, তা সহজে বুঝতে পারেন ভোক্তারা।
বিশেষ করে অষ্টভুজ আকৃতির সতর্কবার্তা ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যের ক্ষতিকর উপাদান সম্পর্কে দ্রুত ধারণা দেওয়া সম্ভব। এতে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য সহজে বোঝা যায় এবং ভোক্তারা খাবার কেনার সময় সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত পণ্য কেনার প্রবণতা কমাতেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগের বোঝা কমাতে এ ধরনের লেবেলকে প্রমাণভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রচারণা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর মোড়কজাত খাবার ও পানীয় সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনে সতর্কবার্তা ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা প্রণয়নে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ভোক্তারা খাবারের উপাদান সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারবেন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচনে সহায়তা পাবেন।
আয়োজকেরা জানান, দুই মাসব্যাপী এ প্রচারণায় ভিডিও ও অডিও বিজ্ঞাপন, স্থিরচিত্র এবং জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হবে। টেলিভিশন, রেডিও, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন ও মুদ্রিত সংবাদপত্র এবং গুগল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচারণার বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হবে। অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সোশ্যাল মিডিয়াও এসব উপকরণ প্রচার করা হবে।
প্রচারণার মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়তে থাকা অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বির বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের মোড়কে স্পষ্ট সতর্কবার্তা সংবলিত লেবেল চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্য ও পানীয়ের মোড়কের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল ব্যবহারের জন্য কার্যকর প্রবিধানমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতা করাও এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আশা, জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ প্রচারণা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যপরিবেশ গড়ে তুলতে নীতিগত উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. সোহেল রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস।
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন আহমেদ, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের এবং সিএলপিএর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
সবার দেশ/কেএম




























