সিলেটে ৩ খুনের দায়ে কথিত প্রেমিক গ্রেফতার
গৃহকর্মীর প্রেমের বলি সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতি
সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ীর মিতালী আবাসিক এলাকায় একই ঘরের মধ্যে এক বৃদ্ধ দম্পতি ও তাদের কিশোরী গৃহপরিচারিকাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়া (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, নিহত কিশোরী গৃহপরিচারিকা তাহমিনার (১৫) সঙ্গে বাবুলের কথিত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে রায়নগরের মিতালী-১১১ নম্বর ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন বাড়ির গৃহকর্তা আব্দুস সত্তার মিয়া (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (১৫)। আব্দুস সত্তার মিয়া সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক ছিলেন। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, নিহত দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। দেশে ওই বাড়িতে শুধু আব্দুস সত্তার মিয়া ও সুরাইয়া বেগম থাকতেন। তাদের সঙ্গে কিশোরী তাহমিনা গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন।
বুধবার সকালে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একই ঘর থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে হত্যাকারীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে সিলেট মহানগর পুলিশ।
বুধবার সন্ধ্যায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে বিকেল ৩টার দিকে রায়নগর এলাকা থেকেই সন্দেহভাজন বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর ওই ব্যক্তি এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও প্রযুক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
পুলিশ জানায়, বাবুল পেশায় রংমিস্ত্রি। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজও করতেন। প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে ওই বাড়িতে কাজের সূত্রে কিশোরী গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে কথিত সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার সকালে বাবুল ওই বাড়িতে গেলে তাহমিনা দরজা খুলে দেয়। এরপর তাদের মধ্যে কোনও একটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বাবুল তার সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তাহমিনার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সত্তার মিয়া ঘটনাটি টের পেয়ে এগিয়ে এলে তার সঙ্গে বাবুলের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এতে তিনজনই গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল ওই বাসার ব্যালকনির খোলা অংশ দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে যান বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ। পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি পাশের একটি খালি প্লটে ফেলে দেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধারে অভিযান চলছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ঠিক কী কারণ ছিলো, পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিলো কি না এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহত কিশোরী গৃহপরিচারিকার সঙ্গে বাবুলের কথিত সম্পর্কের প্রকৃত ধরন ও হত্যাকাণ্ডের আগে তাদের মধ্যে কী নিয়ে বিরোধ হয়েছিলো, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। একই পরিবারের বৃদ্ধ দম্পতি এবং তাদের গৃহপরিচারিকাকে একই সময়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























