সারারাত অনাহারে বাবা—ভাইরাল হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য
এক রুটি, এক কাপ চা—মেয়ের পিতৃবৎসলে কাঁদলো নেটদুনিয়া
একটি রুটি আর এক কাপ চা হাতে বাবার কাছে ছুটে যাওয়া ছোট্ট মেয়েটির হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। চুরির অভিযোগে বাবাকে বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের খবর শুনে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় শিশুটি। সারারাত অনাহারে থাকা বাবাকে নিজের হাতে রুটি ও চা খাওয়ানোর সেই দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আবেগাপ্লুত হয়েছেন অনেকেই।
ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের। শুক্রবার দিবাগত রাতে ছিচকে চুরির অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন রায়হানুল হক অনিক শিকদারকে বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবার ভোরে বাবার আটকে রাখার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় তার শিশু মেয়ে। পরে বাজারের একটি দোকান থেকে রুটি ও এক কাপ চা কিনে এনে বাবাকে নিজের হাতে খাওয়ায় সে। স্থানীয় এক যুবক ওই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর শিশুটির বাবার পরিচয় ও ঘটনার বিস্তারিত জানতে বিভিন্ন মহলে আগ্রহ তৈরি হয়। সর্বশেষ রোববার বিকেলে ঘটনাস্থল ও পরিবারের খোঁজ নিতে সেখানে যান উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন।
ভুক্তভোগী রায়হানুল হক অনিকের দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে স্থানীয় কয়েকজন তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চোর আখ্যা দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করেছেন। তিনি চুরির সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অনিকের ছোট্ট মেয়েকে বাবার পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়। সে বলে,
আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। সে কখনো চুরির সঙ্গে জড়িত হতে পারে না।
অনিকের স্ত্রী জানান, তার স্বামী একসময় কয়েকজন বন্ধুর প্ররোচনায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবে তিনি কখনও চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। পূর্বশত্রুতার কারণে কয়েকজন তাকে জোরপূর্বক বেঁধে রেখে মারধর করেছেন এবং চোর হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
বামরাইলের প্রবাসফেরত ওমর খসরু তুহিন বলেন, অনিক পারিবারিকভাবে ভালো, সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত পরিবারের সন্তান। তবে মাদকের কারণে তার পরিবার ও বংশের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ভাষ্য, অনিক যথেষ্ট শিক্ষিত ও মার্জিত।
এদিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি নজরে আসার পর শিশুটির খোঁজ নিতে মাঠে নামে ‘উই আর বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন। উজিরপুর থানা পুলিশও তাদের সহযোগিতা করে।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আকবর বলেন, তথ্য যাচাই করে তারা জানতে পেরেছেন, অনিকের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তার বাবা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ ছিলেন। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে অনিক নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং সে সুযোগ স্থানীয় মাদকচক্রের লোকজন নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এসএম আকবর বলেন, ভিডিওটি দেখে তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারেননি। পরে বরিশালের স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে শিশুটির খোঁজ নেয়া হয়। তার ভাষ্য, মেয়েটি বাবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছে। অনিকও নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান।
অনিককে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে এসএম আকবর বলেন, বিষয়টি নিয়ে উজিরপুর থানা পুলিশের সঙ্গে কথা হয়েছে। থানার পরিদর্শক তদন্ত ফারুক হোসেনও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি জানান, গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় অনিক একটি অটোভ্যান চেয়েছেন। তাকে একটি অটোভ্যান কিনে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার মেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ অনিকের সঙ্গে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছেন। তার কর্মহীন জীবনের কথা শুনে অনেকে আর্থিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়েছেন।
বাবার প্রতি ছোট্ট মেয়েটির ভালোবাসার এ দৃশ্য তাই শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগের জন্ম দেয়নি, পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও তৈরি করেছে। এক রুটি ও এক কাপ চায়ের সে মুহূর্ত এখন বাবার প্রতি সন্তানের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
সবার দেশ/কেএম




























