ম্লান হচ্ছে সরকারের অর্জন
দখল, হামলা, লুটপাটে উত্তপ্ত রাজধানী: আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় রাজধানীতে কয়েক দিনের ব্যবধানে দখলচেষ্টা, অস্ত্রধারীদের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়া থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুরে জমি দখলের চেষ্টা, আদাবরে বাড়ি দখলের অভিযোগ এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা—এসব ঘটনায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে লুটপাট চালানোর পর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এ ঘটনায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে জমি দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শিশুদের টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার মতো কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো গাফিলতি ছিলো কি না, তা খতিয়ে দেখতে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে।
এর পর শনিবার রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতেও হামলা চালানো হয়। পুলিশ বলছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজের সঙ্গে পাশের জমির মালিকদের বিরোধের জের ধরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঘটনাটিকে ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের প্রাথমিক তদন্তে হামলার সঙ্গে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র পাওয়া গেছে এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার বিষয়টি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সময়ে রাজধানীর আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। বাড়ির মালিকপক্ষের দাবি, রামদা, চাপাতি ও পিস্তলসহ ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল সকালে বাড়িটির সামনে এসে গেট ভাঙচুর ও বাসিন্দাদের বের হয়ে যাওয়ার জন্য হুমকি দেয়। পরে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেয়া হয়। এ ঘটনায় বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়েও জমি দখলকে কেন্দ্র করে একটি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ এবং মালামাল সরিয়ে নেয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে বলে জানা গেছে। ঘটনাটি জমির দখল নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পুলিশ সূত্রে বলা হয়েছে।
এদিকে উত্তরাতেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সমিতির নিয়ন্ত্রণ নেয়াকে কেন্দ্র করে অতীতে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ সামনে এসেছে। উত্তরার রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স ব্যবসায়ী সমিতি দখলের অভিযোগে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনাও রয়েছে। একই এলাকায় একটি ওয়্যারহাউসে তালা লাগিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগও করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিলেঅ। এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
রাজধানীতে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে একাধিক ঘটনায় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম অভিযোগ হিসেবে এসেছে। তবে অভিযোগ ওঠা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। এসব ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত, কার নির্দেশে বা কী উদ্দেশ্যে হামলা হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের বিষয়।
প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা
পরপর এসব ঘটনা ঘটায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দিনের আলোতে কিংবা জনবহুল এলাকায় অস্ত্রের প্রদর্শন, হামলা ও দখলের চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আগাম তথ্য সংগ্রহ ও দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাকে তিনি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। এ ঘটনায় গ্রেফতারের তথ্যও জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ঘটনায় পুলিশি ভূমিকা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার নয়, কোনও ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ছিলো কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসছে।
রাজনৈতিক প্রচারণা নিয়েও বিতর্ক
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি প্রচারণাও তীব্র হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কেউ কেউ এসব ঘটনাকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ঘটনার পেছনে স্থানীয় বিরোধ, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা অপরাধী চক্রের ভূমিকার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।
ফলে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং কারা জড়িত তা স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একটি ঘটনার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও ব্যক্তি বা স্থানীয় নেতার নাম উঠে আসা এবং ওই দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বা সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে নাগরিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দখলচেষ্টা, অস্ত্র প্রদর্শন, হামলা ও ভাঙচুরের মতো অপরাধ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফরের সময় এসব ঘটনা ঘটেছে—এটি সময়গতভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সরাসরি কোনও সম্পর্ক রয়েছে, এমন তথ্য এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং প্রতিটি ঘটনার পেছনে স্থানীয় জমি, সম্পত্তি, ব্যবসা বা অন্য বিরোধের আলাদা আলাদা অভিযোগ রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—অভিযোগগুলোর কতটা সত্য, কারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোথাও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে কি না। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে একদিকে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হবে।
সবার দেশ/কেএম




























