ইউপি সদস্যের জালিয়াতি
বয়স্কভাতার টিপসইয়ে জমি হাতছাড়া বৃদ্ধের
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বয়স্কভাতার কার্ড করে দেয়ার কথা বলে ৮৫ বছর বয়সী এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও মানসিক সমস্যায় ভোগা বৃদ্ধের ১৪ শতক ফসলি জমি লিখে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভাতার কার্ড করে দেয়ার আশ্বাসে বৃদ্ধের টিপসই নেয়া হয়। পরে তার হাতে ভাতা হিসেবে মাত্র ৫ হাজার টাকা তুলে দেয়া হয়। এরপর বৃদ্ধ জানতে পারেন, তার জমি অন্যের নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে এবং প্রতারণার মাধ্যমে করা জমির দলিল বাতিলের দাবি জানিয়ে উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী আজিজুল হক ও তার পরিবার। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে উপজেলা প্রশাসন। এদিকে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দলিল লেখককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়।
গত ৪ অক্টোবর উপজেলার কয়ড়া ইউনিয়নের বাঘলপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। দলিলের নকল ও সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘলপুর মৌজায় আজিজুল হকের ১৪ শতক জমি ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা মূল্য দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়। জমির গ্রহীতা হিসেবে দলিলে নাম রয়েছে একই গ্রামের মৃত ময়নাল সরকারের তিন ছেলে সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ, শাহ আলম ও শাহাদাৎ হোসেনের।
অভিযোগ অনুযায়ী, বৃদ্ধ আজিজুল হক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তার এ অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বয়স্কভাতার কার্ড করে দেয়ার কথা বলে জমি লিখে নেয়া হয়েছে। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের পরিবর্তে পৌর শহরের একটি বাড়িতে কমিশনের মাধ্যমে দলিল সম্পাদন করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি করা হয়েছে কৌশলে এবং তাদের অজান্তে।
ভুক্তভোগীর ছেলে ফারুক সরকার জানান, তার বাবা চোখে দেখতে পান না। এ ছাড়া তিনি আগে পাবনা মানসিক হাসপাতালেও চিকিৎসা নিয়েছেন। এমন একজন অসহায় মানুষকে বয়স্কভাতার কার্ড করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে জমি লিখে নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত অন্যায়।
ফারুক সরকারের অভিযোগ, তার বাবাকে জমি বিক্রির বিষয়টি বুঝতে না দিয়েই কাগজে টিপসই নেয়া হয়েছে। পরে তার হাতে মাত্র ৫ হাজার টাকা দেয়া হয়। অথচ দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা। পরিবারের দাবি, জমি বিক্রির বিষয়ে বৃদ্ধের প্রকৃত সম্মতি ছিলো না। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি প্রতারণার মাধ্যমে সম্পাদিত দলিল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তারা।
দলিল লেখক আব্দুল মতিন জানান, সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং দাতা ও গ্রহীতাদের ছবি দিয়ে দলিল প্রস্তুত করতে বলেছিলেন। সে অনুযায়ী কমিশনের মাধ্যমে একটি বাড়িতে দলিল সম্পাদন করা হয়।
আব্দুল মতিনের ভাষ্য, দলিল তৈরির সময় জমি হস্তান্তরের পেছনে কোনও প্রতারণার ঘটনা রয়েছে, তা তিনি জানতেন না। পরে বিষয়টি জানার পর তিনি বুঝতে পারেন, কৌশল ও প্রতারণার মাধ্যমে বৃদ্ধের কাছ থেকে জমি লিখে নেয়া হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দলিল লেখক আব্দুল মতিনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়। উল্লাপাড়ার সাব-রেজিস্ট্রার ফারহানা আজিজ জানান, বৃদ্ধ অসুস্থ থাকায় আবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর দলিল লেখককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে জমি লিখে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ। তার দাবি, বয়স্কভাতার কার্ড করে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জমি নেয়া হয়নি। বরং বৃদ্ধ আজিজুল হককে নগদ ৭ লাখ টাকা দিয়ে জমিটি কেনা হয়েছে। সরকারি বিধিবিধান মেনেই জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও মানসিক সমস্যায় ভোগা একজন প্রবীণ ব্যক্তির জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তার সম্মতি, দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া এবং অর্থ পরিশোধের বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবে কি না, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।
সবার দেশ/কেএম




























