রামুতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধারে আতঙ্ক
দেড় দশক ধরে বোমার ওপর কাপড় ধোয়া
কক্সবাজারের রামু উপজেলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি শক্তিশালী অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অবাক করা বিষয় হলো, এ বোমাটির ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে স্থানীয় মানুষ, বিশেষ করে নারীরা নিয়মিত কাপড় ধুয়ে আসছিলেন—কিন্তু কেউই বুঝতে পারেননি যে সেটি ছিলো ভয়ংকর এক বিস্ফোরকের উৎস।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, শুরুতে কেউ ধারণাই করেননি এটি বোমা হতে পারে। তিনি বলেন, তখন আমরা বুঝিই নাই এটা বোমা। সামনে পাখার মতো অংশ ছিলো, একটা শেকল আর থালার মতো একটা লকারও ছিলো। সেগুলো আমরা ভেঙে ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।
আরেক বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, এত বছর ধরে এখানে মানুষ যাতায়াত করেছে, কাপড় ধুয়েছে, অথচ আল্লাহর রহমতে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি।
জানা গেছে, রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লট উখিয়ারঘোনা তচ্ছাখালী এলাকার একটি পুকুরপাড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভারী ধাতব বস্তু পড়ে ছিলো। স্থানীয়দের ধারণা ছিলো, এটি হয়তো কোনো পুরনো লোহার খণ্ড। ফলে বিষয়টি কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
পুলিশ সূত্র জানায়, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর আগে পুকুর সংস্কারের সময় স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি পানির ভেতর থেকে ওই ধাতব বস্তুটি তুলে পাড়ে রেখে দেন। এরপর থেকেই সেটিকে ঘিরে চলতে থাকে দৈনন্দিন কাজকর্ম। বিশেষ করে আশপাশের নারীরা সেটির ওপর দাঁড়িয়ে নিয়মিত কাপড় ধুতেন।
ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে গত বৃহস্পতিবার, যখন রামুর ইতিহাস গবেষক ও আইনজীবী শিরূপন বড়ুয়া তার ফেসবুক আইডিতে বোমা সদৃশ বস্তুটির ছবি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জাপানি বোমা হতে পারে এবং এতে বিস্ফোরক রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে এক সচেতন নাগরিক বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতায় বিষয়টির গুরুত্ব সামনে আসে। রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি বড় অবিস্ফোরিত বোমা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বোমাটিকে নিরাপদ স্থানে রেখে চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীকে জানানো হয়েছে।
এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যামুনিশন বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌসের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেনা সূত্রে জানা গেছে, বোমাটির আনুমানিক ওজন ৩০০ থেকে ৩২০ কেজি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৯ সেন্টিমিটার এবং ব্যাস প্রায় ১১৭ সেন্টিমিটার, যা এটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
বর্তমানে বোমাটির চারপাশে শক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে এবং এলাকাবাসীকে নিরাপদ দূরত্বে সরে থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বোমাটি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
এলাকাবাসীর মধ্যে এখন আতঙ্কের পাশাপাশি বিস্ময়ও কাজ করছে—দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি শক্তিশালী অবিস্ফোরিত বোমার এতো কাছে থেকেও কোনো বড় দুর্ঘটনা না ঘটায় অনেকেই এটিকে অলৌকিক রক্ষা হিসেবে দেখছেন।
সবার দেশ/কেএম




























