হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের অবসান
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নাম ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, বিতর্কের শীর্ষে— আবার অনেকে তাকে উন্নয়নের প্রতীক বলেও মনে করেন। প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থেকে ক্ষমতাকে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হলো মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড ঘোষণার মধ্য দিয়ে।
তবে এ সমাপ্তির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পথচলার বিস্তৃত ইতিহাস— সংগ্রাম, ক্ষমতার বিস্তার, বিতর্ক, আন্দোলন দমন এবং অবশেষে গণঅভ্যুত্থনে পতন।
নির্বাসন থেকে নেতৃত্ব— আওয়ামী লীগের হাল ধরার শুরু
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানোর পর ছয় বছরের নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হন শেখ হাসিনা। তখন দলটি ছিল ভঙ্গুর অবস্থায়— তিনি সংগঠন পুনর্গঠন শুরু করেন এবং একসময় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন দলের একক নেতৃত্বে।
জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৮০’র দশকে আন্দোলনে সামনের সারির নেত্রী ছিলেন তিনি। তীব্র আন্দোলন–সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় না এলেও ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয় পান এবং প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
ক্ষমতার ঘাঁটি শক্ত করা— ২০০৮ থেকে রাজনীতি ‘হাসিনা কেন্দ্রিক’
২০০৮ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের চারপাশে সাজাতে শুরু করেন। সংবিধান সংশোধন, প্রশাসন–বিচারব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় বলয় সুদৃঢ় করার মধ্য দিয়ে তার ক্ষমতা হয়ে ওঠে নজিরবিহীন।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪— তিনটি জাতীয় নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয় বিতর্ক, বর্জন ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে। কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, কখনো রাতের ভোট— প্রতিটি ধাপে শক্তি আরও কেন্দ্রীভূত হয় শেখ হাসিনার হাতে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান— ক্ষমতার শেষ অধ্যায়
২০২৪ সালে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র–জনতার আন্দোলন দেশজুড়ে আগুন ছড়ায়। কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় দমন–নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ দাবিতে। সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় শত শত মানুষ— যা আজ পরিচিত ‘জুলাই গণহত্যা’ হিসেবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট দেশত্যাগ করে ভারত চলে যান। এর পরদিন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগ।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার প্রক্রিয়া— আসামির কাঠগড়ায় শেখ হাসিনা
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই জুলাই গণহত্যার বিচার শুরু হয়। একাধিক মামলার প্রধান আসামি হিসেবে ট্রাইব্যুনালে মুখোমুখি হন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্ষমতার অপব্যবহার, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে প্রাণঘাতী হামলার নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির দণ্ড ঘোষণা করেছে।
ভারতের দিল্লিতে পলাতক— ফেরত পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা
বর্তমানে শেখ হাসিনা অবস্থান করছেন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। তাকে প্রত্যর্পণ করা হবে কি না— এ নিয়ে শুরু থেকেই ছিলো অনিশ্চয়তা। রায়ের পর ইন্টারপোলে অনুরোধ পাঠানোর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বিশ্ব ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
যেমনটি ঘটে এসেছে বিশ্বের বহু স্বৈরশাসকের ক্ষেত্রে— ক্ষমতার অপব্যবহার, গণহত্যা ও দমন–পীড়নের পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় বিচার ও দণ্ড। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ইতিহাস যেন একই চক্র ঘুরিয়ে আনলো।
সবার দেশ/কেএম




























