কঠোর বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
‘চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়, জবাবদিহি করতে হবে এমপিদের’
দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিএনপিতে জায়গা নেই। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ কিংবা কোনো ধরনের অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে নেতাকর্মী, সংসদ-সদস্য (এমপি) কিংবা মন্ত্রী—কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।
একই সঙ্গে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংসদ-সদস্যদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক ও সক্রিয় থাকারও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
রোববার (১১ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় এসব নির্দেশনা দেন তারেক রহমান। সংসদ ভবনের নবম তলায় সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা। সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শুরু হওয়া সভা শেষ হয় রাত ৯টা ২০ মিনিটে। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি।
সভা সূত্র জানায়, সংসদ-সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। সংসদ-সদস্যদেরও জবাবদিহি করতে হবে। অনেক সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিরা কর্মীবান্ধব না হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান জানান, কোনও নেতাকর্মী অন্যায় বা অপকর্মে জড়ালে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না।
সভায় প্রধানমন্ত্রী সংসদ-সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যার কথাও শোনেন। নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার পরিস্থিতি, জনগণের প্রত্যাশা এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে নির্দেশনা
সভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংবিধান সংশোধন এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্ব পায়। এসব বিষয়ে সংসদ-সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ নিজ এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দেন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি, দলের ঐক্য বজায় রাখা এবং প্রার্থী বাছাই নিয়েও আলোচনা হয়। নির্বাচনে জনপ্রিয়তা, যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন সংসদ নেতা। জাতীয় নির্বাচনে পাওয়া সাফল্যের ধারাবাহিকতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ধরে রাখতে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার তাগিদ দেয়া হয়।
সভায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারে গঠিত বিশেষ কমিটির কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। এসব বিষয়ে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরা হয় বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।
আট মাসের কাজের অগ্রগতি জানতে চান প্রধানমন্ত্রী
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সভায় অংশ নেয়া এক সংসদ-সদস্য জানান, সরকার গঠনের পর গত আট মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী কাজ হয়েছে, সেসব কাজের অগ্রগতি কতটা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না, তা জানতে চান প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া সংসদ-সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার সমস্যা, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বিষয়েও খোঁজ নেন তিনি। জনপ্রতিনিধিদের জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু গণমাধ্যমকে বলেন, সভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার তাগিদ দিয়েছেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সংসদ-সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, বৈঠকে সংসদ-সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের জনগণের সঙ্গে থেকে কাজ করার এবং মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে দলের সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
অধিবেশনের আগেই বিশেষ সভা
সাধারণত জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর আগের দিন অথবা অধিবেশন শুরুর দিন সরকারি দলের সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এবার নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সম্ভাব্য সংসদ অধিবেশনের আগেই বিশেষ এ সভা আহ্বান করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।
দলীয় শৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এ সভাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান এবং সংসদ-সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার বার্তা দলের নেতাকর্মীদের জন্য স্পষ্ট সতর্কসংকেত হিসেবে এসেছে।
সভায় দেয়া নির্দেশনার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা মেনে চলা এবং নিজ নিজ এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এখন এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে দলীয় তদারকি, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থার ওপর।
সবার দেশ/কেএম




























