যুদ্ধের আগুনে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র
ইরান যুদ্ধে মাইনকার চিপায় ট্রাম্প?
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এ অভিযান শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর জন্যই বড় রাজনৈতিক ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। শুরুটা ছিলো শক্ত বার্তা দিয়ে, কিন্তু এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের আকাশে বিমান হামলার পর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। পেন্টাগন এ অভিযানকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, এ যুদ্ধের সমাপ্তি হবে আমেরিকার শর্তে।
তবে ইতিহাসবিদরা সতর্ক করছেন, এমন আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা অতীতেও শোনা গেছে। ২০০১ সালে আফগানিস্তান অভিযানের শুরুর দিকেও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। সে যুদ্ধ শেষ হতে লেগেছিলো দুই দশক, যার খরচ ছিলো বিপুল। পরিণাম আফগানিস্তান থেকে লেজ গুটিয়ে পালানো।
বর্তমান অভিযানের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর নিহত হওয়ার খবর। এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর যৌথ অভিযানে ইরানের দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় ধাক্কা লেগেছে।
এ যুদ্ধকে অনেকেই উচ্চঝুঁকির কৌশল হিসেবে দেখছেন। সফল হলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ কয়েক দশকের শত্রুতার অবসান ঘটতে পারে। কিন্তু ব্যর্থ হলে পুরো অঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে CNN তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছে।
প্রথম সম্ভাবনা, ইরানের ওপর ধারাবাহিক বিমান হামলার ফলে সেখানে গণঅভ্যুত্থান ঘটতে পারে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা, ইরানের অবশিষ্ট ক্ষমতাকাঠামো আরও শক্তভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে। এতে দেশটি সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রাজনৈতিকভাবে আরও কট্টর অবস্থানে চলে যেতে পারে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হতে পারে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দিয়ে তাকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দুর্বল করা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক আশঙ্কা হলো, ইরান যদি লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে দেশটির পরমাণু কর্মসূচি ও অস্ত্রভাণ্ডারের নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে, এ অভিযান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের জন্য। আবার কখনও বলা হচ্ছে, এটি ইরানি জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে। বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্য নির্ধারণে অস্পষ্টতা দীর্ঘমেয়াদে বড় কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনও দেশে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ইতিহাসে খুব কমই সম্ভব হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা সে বাস্তবতাই তুলে ধরে। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে এখনও এমন কোনোও মধ্যপন্থী নেতৃত্বের উত্থান দেখা যায়নি, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করতে পারে। বরং কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
এ যুদ্ধে একটি কৌশলগত দিকও রয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও চীন-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হলে ইউক্রেন যুদ্ধেও প্রভাব পড়তে পারে, কারণ রাশিয়ার জন্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও চাপে পড়বে। জনমতের জরিপে দেখা যাচ্ছে, অনেক মার্কিন নাগরিক এ অভিযানের ব্যাপারে সন্দিহান।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্য দ্রুত ও দৃশ্যমান সাফল্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইরান যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত করার কৌশল নেয়, তাহলে তা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরই চাপ বাড়াবে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। পেন্টাগন বিজয়ের বার্তা দিলেও বাস্তবতা হলো—যুদ্ধের আগুন একবার ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ নয়। ইরান অভিযান ট্রাম্পের জন্য কৌশলগত সাফল্য হয়ে উঠবে, নাকি রাজনৈতিক বোঝা—তার উত্তর দেবে সময়ই।
সবার দেশ/কেএম




























