ক্রিপ্টোকারেন্সিতে তেহরানের উত্থান, ওয়াশিংটনের পাল্টা অবরোধ
‘গুপ্ত’ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থযুদ্ধেও!
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক চাপের মধ্যেই এবার সামনে এসেছে ইরানের আরেকটি নীরব যুদ্ধের চিত্র—ক্রিপ্টোকারেন্সিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক জটিল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লড়াই। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ সরানো, তেল বাণিজ্য পরিচালনা এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। আর সে পথ বন্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ওয়াশিংটন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে তেহরানের বাসিন্দা ফিরোজ নামের এক ক্রিপ্টো ব্যবহারকারী নিজের সব ডিজিটাল সম্পদ স্থানীয় প্ল্যাটফর্ম ‘নোবিটেক্স’ থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত ওয়ালেটে স্থানান্তর করেন। তার আশঙ্কা ছিলো, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্ল্যাটফর্মগুলো হয়তো সাইবার হামলা কিংবা সরকারি হস্তক্ষেপের শিকার হতে পারে।
আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টো লেনদেন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান চেইনালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইরানের ক্রিপ্টো অর্থনীতির আকার ছিলো প্রায় ৭৭৮ কোটি ডলার। তবে এ বাজার শুধু সাধারণ মানুষের মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার আশ্রয় নয়; বরং দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এ খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করা সহজ এবং এর উৎস শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন। ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রি, অস্ত্র কেনাবেচা এবং বৈদেশিক অর্থ স্থানান্তরে এটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আইআরজিসি ক্রিপ্টোকারেন্সিকে কৌশলগত অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে ধারণা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর।
এদিকে ইরানের এ বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে ধারাবাহিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত এপ্রিলে তেহরান ঘোষণা দেয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের জাহাজগুলোকে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাশুল পরিশোধ করতে হবে। এরপরই ওয়াশিংটন আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
চেইনালাইসিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ক্যাটলিন মার্টিন বলেন, যেসব দেশ কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে, তারা সাধারণত বিকল্প অর্থায়নের পথ হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এরই ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ক্রিপ্টো ওয়ালেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একই সঙ্গে প্রায় ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ডিজিটাল সম্পদ জব্দের কথাও জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, তেহরান দেশের বাইরে যে অর্থ সরানোর চেষ্টা করছে, আমরা তার প্রতিটি উৎস শনাক্ত করবো এবং শাসনের সঙ্গে যুক্ত সব আর্থিক লাইফলাইন লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেবো।
তবে সাধারণ ইরানিদের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ছিলো ভিন্ন বাস্তবতা। ২০১৮ সালের পর থেকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় বহু মানুষ নিজেদের সঞ্চয়ের মূল্য ধরে রাখতে ডিজিটাল মুদ্রার দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ খাতেও রাষ্ট্রীয় ও সামরিক প্রভাব বাড়তে থাকে।
তেহরানভিত্তিক এক গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, আইআরজিসি ভর্তুকি মূল্যের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাপক হারে ক্রিপ্টো মাইনিং করছে এবং সে অর্থ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ব্যবহার করছে। এর ফলে সাধারণ ইরানিরা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
ইরানের পুরো ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমকে ইতোমধ্যে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওফ্যাক)। ফলে বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ইরানি নাগরিকদের সঙ্গেও আর্থিক সম্পর্ক স্থাপনে ভয় পাচ্ছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাত শুরুর আগে নোবিটেক্স থেকে অর্থ সরানোর হার প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এলিপ্টিক জানিয়েছে, হামলার প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্রিপ্টো লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। একই বছরের ১৮ জুন এক বড় সাইবার হামলায় নোবিটেক্স থেকে প্রায় ৯ কোটি ডলার সমমূল্যের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়।
অন্যদিকে, ইরানও নিজেদের কৌশল আরও আক্রমণাত্মকভাবে বদলে নিচ্ছে। জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ইউএসডিটি—ডলার সমর্থিত এক ধরনের স্টেবলকয়েন—ক্রয় করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সিকে ঘিরে এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূরাজনৈতিক এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সেখানে একদিকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে টিকে থাকার লড়াই করছে তেহরান, অন্যদিকে সে গোপন আর্থিক নেটওয়ার্ক ধ্বংসে প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও অর্থনৈতিক অবরোধকে একসঙ্গে ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন।
সবার দেশ/কেএম




























