দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার অনির্বাণ শিখা কবি নজরুল
নিভে গেছে প্রাণের প্রদীপ, নিভেনি নজরুলের আগুন
দ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অমর কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে নক্ষত্র একদিন বিদ্রোহের দীপ্তি ছড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছিলেন বজ্রকণ্ঠ, আজ তার প্রয়াণের অর্ধশতাব্দী। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) থেমে যায় এ অনন্য প্রতিভার জীবনস্পন্দন। কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে থেমে যায়নি তার কণ্ঠ; বরং তার কবিতা, গান ও দর্শন আজও বাঙালির চেতনায় অনির্বাণ প্রদীপের মতো জ্বলছে।
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের এক সাধারণ কাজী পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। দারিদ্র্য ছিলো তার শৈশবের নিত্যসঙ্গী, অভাব ছিলো জীবনের নির্মম শিক্ষক। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে দমাতে পারেনি; বরং জীবনসংগ্রামের আগুনেই তিনি নিজেকে শাণিত করেছেন। সে সংগ্রাম থেকেই জন্ম নিয়েছে এমন এক কবিসত্তা, যার কলমে কখনো ধ্বনিত হয়েছে বিদ্রোহের দামামা, কখনো প্রেমের বাঁশি, কখনো মানবতার জয়গান।
নজরুল লিখেছেন—
‘বল বীর—
বল উন্নত মম শির!’
এ উচ্চারণ কেবল কবিতার পঙ্ক্তি নয়, নিপীড়িত মানুষের আত্মমর্যাদার অমর ঘোষণাও বটে। তার বিদ্রোহ ছিলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তার সাম্যবাদ ছিলো মানুষে মানুষে বিভেদহীনতার স্বপ্ন, আর তার মানবতাবাদ ছিলো ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে মানুষের জয়গান।
মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে নজরুল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে দিয়ে গেছেন এক বিস্ময়কর মহাভাণ্ডার। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গজল, হামদ, নাত, শ্যামাসংগীত—সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি অঙ্গনেই রেখেছেন তার স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর। তার কলমে যেমন উচ্চারিত হয়েছে বিদ্রোহ, তেমনি প্রেমও পেয়েছে নতুন ভাষা; যেমন এসেছে সাম্যের আহ্বান, তেমনি ফুটে উঠেছে অসহায় মানুষের প্রতি গভীর মমতা।
তিনি নিজেই যেন তার বহুমাত্রিক সত্তাকে এক পঙ্ক্তিতে ধারণ করেছিলেন—
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য।’
এক হাতে প্রেমের সুর, অন্য হাতে প্রতিবাদের অস্ত্র—এ দ্বৈততাতেই নজরুল অনন্য। তার গান কখনও হৃদয়ের গোপন দরজায় কড়া নেড়েছে, কখনও শোষিত মানুষের মিছিলকে দিয়েছে সাহস। তার কণ্ঠে তাই একই সঙ্গে বেজেছে প্রেম ও বিদ্রোহ, মরমি আবেগ ও বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
নজরুলের কবিতায় মানুষই ছিলো সর্বোচ্চ সত্য। তার অমর উচ্চারণ—
‘গাহি সাম্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।’
এ সাম্যের স্বপ্ন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সমাজের বিভাজন, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার বিপরীতে নজরুলের সাহিত্য আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের চেয়ে বড় কোনও পরিচয় নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও তাই কেবল একজন কবির সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; এটি গভীর আত্মিক বন্ধনের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে সপরিবারে কবিকে বাংলাদেশে আনা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাকে দেয়া হয় জাতীয় কবির মর্যাদা। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে তার বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছর ২১ ফেব্রুয়ারি তাকে দেয়া হয় একুশে পদক। আর মৃত্যুর পরও তার শেষ ঠিকানা হয়ে থাকে প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে, যেখানে আজও প্রতিদিন মানুষ শ্রদ্ধাভরে মাথা নত করে।
নজরুলের মৃত্যু হয়েছিলো ১৯৭৬ সালে, কিন্তু তার কণ্ঠের মৃত্যু হয়নি। তার কবিতার বিদ্রোহ আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়; তার গান আজও প্রেমিক হৃদয়ে আলো জ্বালে; তার সাম্যের বাণী আজও বৈষম্যের অন্ধকারে পথ দেখায়। তাই অর্ধশতাব্দী পরও তিনি কেবল স্মৃতির কবি নন—তিনি জীবন্ত চেতনা, অবিনশ্বর প্রেরণা।
তারই ভাষায়—
‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর—
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!’
সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও সে শির উন্নত। নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী তাই নিছক শোকের দিন নয়; এটি তার সৃষ্টির কাছে ফিরে যাওয়ার দিন, তার সাম্য ও মানবতার দর্শনকে নতুন করে ধারণ করার দিন। তার বিদ্রোহের আগুনে অন্যায়ের অন্ধকার পোড়ানোর এবং তার প্রেমের আলোয় মানুষের হৃদয় আলোকিত করার দিন।
নানা আয়োজনে স্মরণ
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে দুদিনব্যাপী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হবে। আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
‘আমারে দেবো না ভুলিতে...’ শীর্ষক এ আয়োজনে থাকবে জাতীয় কবির জীবন, সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান।
অন্যদিকে নজরুল একাডেমি আয়োজন করেছে তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি। আজ সকাল ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন জাতীয় কবির সমাধিতে ফাতেহা পাঠ ও ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বাদ জোহর কবির সমাধিসংলগ্ন মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে মিলাদ মাহফিল।
আগামীকাল বিকাল সাড়ে ৫টায় মগবাজারের বেলালাবাদ কলোনিতে নজরুল একাডেমির ‘কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে’ অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ২৯ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৫টায় একই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে তিন দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপনী অনুষ্ঠান।
অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও নজরুল যেন আমাদের কানে কানে বলে যান—
‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
তাই যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠ উচ্চারিত হবে, যতদিন সাম্যের স্বপ্ন দেখা হবে, যতদিন প্রেম ও মানবতার পতাকা উড়বে—ততদিন নজরুল থাকবেন। তার শরীরের অবসান ঘটেছে, কিন্তু তার শব্দের মৃত্যু নেই; তার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়েছে, কিন্তু তার বিদ্রোহের প্রতিধ্বনি আজও বাংলার আকাশে অনন্তকাল ধরে বেজে চলেছে।
লেখক ও সংবাদকর্মী




























