প্রবন্ধ
মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
১৯৯০ সালে 'ভয়েজার-১' পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০০ কোটি কিলোমিটার দূরে পৌঁছে গিয়েছিল। কাজ প্রায় শেষের দিকে, সেই সময় বিজ্ঞানীরা শেষবারের মতো মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর দিকে ক্যামেরা ঘোরাতে বললেন। এত দূরত্ব থেকে পৃথিবীকে আর পৃথিবীর মতো দেখায়নি। দেখা গিয়েছিল সূর্যের আলোর ভেতর ঝুলে থাকা ক্ষুদ্র এক বিন্দু— এতটাই ছোট যে প্রথম দেখায় বোঝাই কঠিন, মানুষের সমগ্র ইতিহাস সে বিন্দুর উপরেই সংঘটিত হয়েছে।
কার্ল সেগান (১৯৩৪-১৯৯৬) ছবিটির নাম দেন 'Pale Blue Dot'। পরে এ নামেই তিনি একটি বই লেখেন—Pale Blue Dot: A Vision of the Human Future in Space।
শুরুতে পুরোপুরি মহাকাশ নিয়ে লেখা মনে হলেও পড়তে পড়তে বোঝা যায়, বইটির প্রসঙ্গ বস্তুত মানুষ। আমরা নিজেদের জীবনকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করি। নিজের দেশ, নিজের ধর্ম, নিজের ভাষা, নিজের কষ্ট— সবকিছুই খুব বড় বলে মনে হয়। কাছ থেকে দেখলে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মহাকাশের দূরত্ব থেকে পৃথিবীকে দেখলে বোঝা যায়, মানুষের সমস্ত ইতিহাস আসলে এ ক্ষুদ্র জায়গার মধ্যে ঘটে চলেছে। যত যুদ্ধ, যত সাম্রাজ্য, যত প্রেম, যত বিভাজন—সবকিছু ওই এক বিন্দুর ওপর।
এ উপলব্ধির মধ্যে এক ধরনের ধাক্কা আছে। মানুষ সাধারণত দুই ধরনের বিভ্রমে বাস করে। একদল ভাবে মানুষ সবকিছুর কেন্দ্র। আরেকদল ভাবে মানুষ অর্থহীন। সেগানের 'Pale Blue Dot' এ দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক তৃতীয় সত্যকে ইঙ্গিত করে। মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় আবার তুচ্ছও নয়। কারণ এ বিশাল, নির্বিকার মহাবিশ্বের এক কোণে অন্তত এমন এক প্রাণ জন্মেছে, যারা নিজের তথা মহাবিশ্বের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
বইটিতে আরও একটি বিষয় ফিরে ফিরে এসেছে—Perspective। দূরত্ব বদলালে বাস্তবতাও বদলে যায়। পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সীমান্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও মহাকাশ থেকে তা দেখা যায় না। পৃথিবীতে মানুষ নিজের পরিচয় নিয়ে বিভক্ত হয়। দূর থেকে দেখলে বোঝা যায়, সবাই একই গ্রহের বাসিন্দা। সেগান আবেগময় বিশ্বভ্রাতৃত্বের কথা বলেন না, একটি বৈজ্ঞানিক সত্যের দিকে আমাদের নিয়ে যান—পৃথিবী অত্যন্ত ছোট, আপাতত এটাই মানুষের একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ আর এ গ্রহের প্রতি দায়িত্বও যৌথ।
বইটি পড়তে গেলে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, নৈতিক ও মানসিক পরিবর্তনেরও দাবি রাখে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে কোনও রাজনৈতিক সীমান্ত চোখে পড়ে না। দেখা যায় না ধর্মীয় বিভাজনও। সেগান বিশ্বনাগরিকত্বের রোমান্টিসিজম প্রচার না করে একটা বাস্তব সত্য তুলে ধরেন— পৃথিবীর পরিবেশ, জলবায়ু ও মানবসভ্যতা পরস্পর গভীরভাবে সংযুক্ত। তাই বিস্ময়ের পাশাপাশি সতর্কও থাকতে হবে।
বইটিতে মহাকাশ অনুসন্ধানের পক্ষে যুক্তিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেগানের মতে, মহাকাশ গবেষণা কেবল প্রযুক্তিগত কৌতূহল নয়, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার প্রশ্নের সঙ্গেও সম্পর্কিত। পৃথিবী সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি গ্রহ। Asteroid Impact, পারমাণবিক যুদ্ধ বা পরিবেশগত বিপর্যয়ের মতো সম্ভাবনা মানবসভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এজন্য মহাকাশ অনুসন্ধানকে তিনি বিলাসিতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখেন।
সেগানের বইয়ের আরেকটা শক্তিশালী দিক সম্ভবত এর ভাষা। তিনি বিজ্ঞানকে এমন একটা পদ্ধতি হিসেবে দেখেন, যা মানুষকে বাস্তবতার প্রতি আরও সৎ হতে শেখায়।
মহাবিশ্বের পরিমাপে মানুষ নিঃসন্দেহে ক্ষুদ্র। কিন্তু সে ক্ষুদ্রতার মধ্যেও একটি ব্যতিক্রমী সত্য আছে—এ মহাবিশ্বের এক কোণে অন্তত এমন এক চেতনার জন্ম হয়েছে, যারা নিজেদের অস্তিত্ব এবং মহাবিশ্ব—উভয়কেই বোঝার চেষ্টা করে। সম্ভবত এখানেই মানুষের প্রকৃত গুরুত্ব। ক্ষমতায় নয়, প্রশ্ন করবার সক্ষমতায়। আধিপত্যে নয়, উপলব্ধিতে।
সবার দেশ/কেএম




























