পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা
৩০ হাজার খাল চিহ্নিত করতে ৩১ কোটি টাকার প্রকল্প
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩০ হাজার খালকে চিহ্নিত, শ্রেণিবিন্যাস ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কারিগরি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। খালগুলোর সুনির্দিষ্ট তথ্যভাণ্ডার না থাকায় এতদিন খনন, পুনর্খনন ও রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিলো—এ প্রকল্পের মাধ্যমে সে সংকট কাটানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
‘বাংলাদেশের খালসমূহ চিহ্নিতকরণ ও শ্রেণিবিন্যাসকরণ এবং জিও ইনফরমেটিক ডাটাবেজ তৈরি’ শীর্ষক প্রকল্পটি নিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সহযোগী সংস্থা হিসেবে থাকবে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত।
সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে সরকার গঠনের প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যেই ১ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে ১২০০ কিলোমিটারের বেশি খননের কাজ দৃশ্যমান হবে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা (আইডব্লিউআরএম) ধারণাকে সামনে রেখে খালগুলোর উৎপত্তিস্থল, আউটফল, প্রবাহপথ, বেসিন ও সাব-বেসিন চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ জিও-ইনফরমেশন সিস্টেমভিত্তিক খাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। বর্তমানে দেশে নদ-নদীর একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার থাকলেও খাল নিয়ে কোনও একীভূত ও মানসম্মত ডাটাবেজ নেই।
বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলের অংশ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পলিতে গড়ে ওঠা এ ভূখণ্ডে হাজারো খালের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে অন্য নদীতে মিলেছে, কোথাও বিল বা বাওরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, আবার কোথাও পাহাড়ি ছড়া হিসেবে পরিচিত। অঞ্চলভেদে ভিন্ন নামে পরিচিত এসব খাল প্রশাসনিকভাবে একক সংজ্ঞা ও নীতিমালার আওতায় নেই।
নতুন প্রকল্পের আওতায় খালগুলোর ধরন, কার্যকারিতা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, নিষ্কাশন ও সেচ সক্ষমতার ভিত্তিতে বড়, মাঝারি ও ছোট—এভাবে ভাগ করা হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কালভার্ট, সেতু, রেগুলেটরসহ অবকাঠামোর তথ্য সংগ্রহ করে জিও-ডাটাবেজে যুক্ত করা হবে।
উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে সংরক্ষিত সিএস ও আরএস মানচিত্র এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র ব্যবহার করা হবে। স্থানীয় জনগণ ও অংশীজনদের মতামতও নেয়া হবে, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি ডাটাবেজে প্রতিফলিত হয়।
এর আগে ‘বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহের তথ্যাদি হালনাগাদকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রবাহমান নদীগুলোর তথ্য হালনাগাদ এবং একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। নতুন খাল ডাটাবেজ সে নদী ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, যাতে পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আরও কার্যকর হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অংশীজনদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন সংক্রান্ত সেলের সভা শেষে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, বর্তমান সরকার পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল খননে সক্ষম হবে বলে তারা আশাবাদী। তিনি জানান, প্রথম ১৮০ দিনে ১ হাজার কিলোমিটার খননের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে ১২০০ কিলোমিটারের বেশি কাজ দৃশ্যমান হবে।
সরকার আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে চায়। এ বিষয়ে বৈঠকে কোন কোন জেলায় প্রধানমন্ত্রী সরাসরি অংশ নেবেন, তা নির্ধারণ করা হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, দিনাজপুরে খাল খননের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচির উদ্বোধন করতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাল চিহ্নিতকরণ ও শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও তথ্যনির্ভর ডাটাবেজ তৈরি হলে ভবিষ্যতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সম্প্রসারণ, পানি সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব বণ্টন স্পষ্ট হলে সংস্থাভিত্তিক সমন্বয় বাড়বে এবং অপচয় কমবে। তাই প্রকল্পটি শুধু তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নয়, বরং দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত শৃঙ্খলা আনার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























