ওয়াকআউটের আভাস বিরোধী দলের
অধিবেশন শুরুর আগেই উত্তপ্ত সংসদ রাজনীতি
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। তবে অধিবেশন শুরুর আগেই সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথম দিনের বৈঠকেই বিরোধী দলের ওয়াকআউটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মূলত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের শপথ না নেয়া, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ আদালতের রুলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান ভিন্ন।
এদিকে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদে ভাষণ দেবেন কি না—তা নিয়েও তর্ক-বিতর্ক চলছে।
রাজনৈতিক সূত্র বলছে, বিরোধী দল অধিবেশনে যোগ দিলেও রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় তারা ওয়াকআউট করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনও জানানো হয়নি।
দীর্ঘ দেড় দশকের একতরফা সংসদের পর এবার নতুন বাস্তবতায় শুরু হচ্ছে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম। এবার সংসদে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়দাবাদী দল (বিএনপি), যারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের কোনও প্রতিনিধি এবার সংসদে নেই।
সংসদ কার্যকর করতে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক বার্তা দেয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায় সরকার। তার মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মফিকুর রহমান বলেছেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকারের ভালো উদ্যোগে সমর্থন দেয়া হবে। তবে ভুল হলে প্রথমে সংশোধনের পরামর্শ দেয়া হবে, তাতে কাজ না হলে প্রতিবাদ এবং প্রয়োজনে জনগণের অধিকারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়া হবে।
ডেপুটি স্পিকার পদ নিয়েও তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন। সরকার বিরোধী দলকে এ পদে নাম প্রস্তাব করার আহ্বান জানালেও বিরোধী পক্ষ এতে সাড়া দেয়নি। তাদের দাবি, খণ্ডিতভাবে পদ গ্রহণ না করে আগে জুলাই সংস্কারের পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ গণভোটে জনগণ সে সংস্কারের পক্ষেই রায় দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এ সংসদের জন্ম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। প্রায় দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকার গঠন করে বিএনপি।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক। সে নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আজ সকাল ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
তবে এবার সংসদের প্রথম বৈঠকের কার্যক্রমেও থাকছে ব্যতিক্রম। আগের সংসদের স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরি পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার সামসুল হক টুকু একটি মামলায় কারাবন্দি থাকায় নতুন সংসদের কোনও সিনিয়র সদস্যের সভাপতিত্বে প্রথম বৈঠক শুরু হবে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অধিবেশন শুরু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা টারেক রহমান একজন সিনিয়র সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন, যিনি প্রথম বৈঠকের সভাপতিত্ব করবেন। এরপর নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।
স্পিকার হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মইন খান-এর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন আলতাফ হোসেন চৌধুরি,িএম ওসমান ফারুক এবং হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় রয়েছেন অঅন্দালিব রহমান পার্থ ও এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
প্রথম দিনের বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া-এর মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে এবং সে বিষয়ে আলোচনা হবে। এরপর সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করবেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের দাবি, গণভোটে উত্থাপিত চারটি বিষয় পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেয়ার অধিকার নেই বলে তারা মনে করেন এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ জানানো হবে।
সব মিলিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হলেও প্রথম দিন থেকেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























