৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে: রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে একপর্যায়ে তা ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসীসহ সমাজের সব স্তরের মানুষের পাশাপাশি গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলনের ফলেই ওই সময়ের সরকার পতন ঘটে। হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে তাবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হওয়ার আগে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা হট্টগোল করেন। পরে রাষ্ট্রপতি বক্তব্য শুরু করলে তারা প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করেন। এ সময় স্পিকার সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকতে এবং সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। প্ল্যাকার্ডে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’ ও ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা বন্ধ কর’সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা দেখা যায়।
ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এ উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণকে ধন্যবাদ জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করেছে এবং নতুন সরকার গঠন করেছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বাধীন সরকারকে তিনি অভিনন্দন জানান।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অবদান স্মরণ করেন এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।
জুলাই–আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আহত বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। পাঁচ শতাধিক মানুষ চোখ হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন।
তিনি জানান, আহতদের চিকিৎসা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চলমান রয়েছে এবং ১৩৭ জন গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। আহতদের জন্য ১২ হাজার ৪৩টি স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা এবং স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন স্থানে ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর এবং ৬৪ জেলায় স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল হলেও দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার।
তিনি জানান, গত এক বছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। একই সময়ে রফতানি বেড়ে ৪৮ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে অনিয়ম তদন্তে বিশেষ তদন্ত কমিশন এবং পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
কৃষি খাতের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তে ১১ লাখের বেশি কৃষক উপকৃত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
সবার দেশ/কেএম




























