মমতা-যুগের অবসান
তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে দিল্লি-কোলকাতা সমন্বয়ের অপেক্ষায় ঢাকা
পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের মমতা-যুগের অবসান ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ রায় শুধু বাংলার রাজনীতি নয়, তিস্তার ভবিষ্যতও পাল্টে দিলো। বাংলাদেশের জন্য এখন একটাই প্রশ্ন: দিল্লির ‘কোলকাতা রাজি না’ অজুহাত কি চিরতরে শেষ হলো?
‘মমতা-বাধা’ অপসারিত, এবার দিল্লির পরীক্ষা
তিস্তা চুক্তি দেড় দশক ধরে আটকে থাকার পেছনে নয়াদিল্লির একটাই জবাব ছিলো— ‘আমরা চাই, মমতা দিচ্ছেন না’। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান ছিলো পাথরের মতো শক্ত: উত্তরবঙ্গ শুকাবে, তবু তিস্তার জল নয়। বিকল্পে তোর্সা-জলঢাকার প্রস্তাবও ছিলো তার। এখন সে অধ্যায় শেষ। কেন্দ্রে মোদী, রাজ্যে শুভেন্দু। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের সামনে আর কোনও রাজনৈতিক স্পিড-ব্রেকার নেই। ঢাকা তাই সোজাসাপ্টা বলছে— অজুহাতের দিন শেষ, এবার ফলাফলের পালা।
ঢাকার বার্তা: নীতিতে অনড়, প্রত্যাশায় স্পষ্ট
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রায়ের পরই মনে করিয়ে দিয়েছেন, The election is taking place in India; it's India's internal matter। আমাদের বিদেশনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। কিন্তু প্রত্যাশার তালিকাও ধরিয়ে দিয়েছেন: পুশ-ইন বন্ধ, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, পর্যটক ভিসা চালু। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ এবছরই শেষ। ‘আমরা খুবই আশাবাদী’, বলেছেন তিনি। অর্থাৎ বার্তা পরিষ্কার— বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু জলের হিস্যা নিয়েই।
বিএনপির অবস্থান: মমতা ছিলেন বাধা, বিজেপি নতুন সম্ভাবনা
বিএনপির তথ্য সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল বিজেপিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন,
Previously, we saw that Mamata Banerjee was actually the impediment to establishing the Teesta Barrage। শুভেন্দু অধিকারীর জয়ে মোদী সরকারের বহু আকাঙ্ক্ষিত তিস্তা চুক্তি এবার এগোবে।
তার যুক্তি সোজা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমান্ত ভাগ করে। কোলকাতা-দিল্লি একসুরে চললে সীমান্তে শান্তি আর নদীতে জল— দুটোই আসবে।
কূটনৈতিক মহলের মূল্যায়ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিনের মত, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল। তারা স্থিতিশীল সম্পর্ক চায়। বিজেপির শাসন তিস্তা বিরোধ মেটাবে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের সতর্কবার্তা, পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করলে সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকবে না। অর্থাৎ ঢাকা বুঝিয়ে দিচ্ছে— ভোটের মাঠের হুঙ্কার আর সরকারের ফাইলের ভাষা এক নয়। বিজেপি ব্যবসা বোঝে। ব্যবসা উগ্রতা পছন্দ করে না।
ছোট দেশের তিন দাবি, বড় পরীক্ষা দিল্লির
বাংলাদেশের চাওয়া তিনটি। এক, তিস্তার ন্যায্য জল। দুই, এনআরসি-আতঙ্ক বন্ধ করে সীমান্তে স্বস্তি। তিন, বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে বাণিজ্য ও যোগাযোগে গতি। বিজেপি অবকাঠামো আর ট্রানজিটের রাজনীতি করে। রেল-নৌ-সড়ক খুললে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলও লাভবান। জেতার পর অর্থনীতি আর প্রতিবেশী-কূটনীতিই শেষ কথা।
মমতা-যুগে দিল্লির হাতে ‘রাজ্য রাজি না’ অজুহাত ছিলো। সে যুগের কফিনে শেষ পেরেক পড়েছে। এখন দিল্লি-কোলকাতা একসুরে চললে চুক্তির কালি শুকাতে এক মাসও লাগবে না। আর যদি না চলে, তাহলে গোটা দুনিয়া বুঝে যাবে— সমস্যা মমতায় ছিলো না, সমস্যা ছিলো সদিচ্ছায়।
অজুহাতের দিন শেষ, এবার ফলাফলের পালা। ঢাকা তাকিয়ে আছে। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ কি শুধু ভোটের স্লোগান, নাকি তিস্তার জলও টানবে— সেটাই এখন দেখার।
সবার দেশ/কেএম




























