চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ধোঁয়াশা
রাড্ডা কাণ্ডের এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
তবে একই সময়ে অন্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এমনকি মিষ্টি নিজেও বুধবার রাতে জানিয়েছিলেন, পদত্যাগের বিষয়ে তিনি কোনও নির্দেশনা পাননি এবং এ সম্পর্কে কিছু জানেন না। ফলে তার পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
কয়েকটি সূত্রের দাবি, মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি আগামী রোববার সকালে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
রাড্ডা সেন্টার ঘিরেই বিতর্ক
গত ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।
ঘটনার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্যও উঠে এসেছে।
মিষ্টির নামও এ ঘটনায় আলোচনায় আসে। তবে তিনি হামলা বা ভাঙচুরের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে দেয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় কোনও বিএনপি নেতা জড়িত নন।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বুধবার জানিয়েছেন, ঘটনায় মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
দলীয় পর্যায়ে কঠোর ব্যবস্থা?
রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই বিএনপির ভেতরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের নেতারা ঘটনায় যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। তবে তখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিষয়টি এখন আরও এক ধাপ এগিয়েছে এবং তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সমিতির সঙ্গে পুরোনো সম্পৃক্ততার তথ্য
রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুরের পর আলোচনায় আসা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সঙ্গে মিষ্টির পুরোনো সম্পৃক্ততার তথ্যও সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন।
এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান সমিতির সঙ্গে মিষ্টির সম্পৃক্ততার একটি দাফতরিক নথি প্রকাশ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাকে সমিতির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ পুরোনো সম্পৃক্ততা রাড্ডা সেন্টারে সাম্প্রতিক হামলা ও ভাঙচুরে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রমাণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন।
পুলিশের তদন্তও চলছে
রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাকারীদের জড়ো করা, দেশীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং এক্সক্যাভেটর আনার সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কয়েকজন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মূল পরিকল্পনাকারী বা নেপথ্যের ব্যক্তিদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য নেই।
পুলিশও জানিয়েছে, মিষ্টির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাজনৈতিক পরিচয়
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য। তিনি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন।
তার প্রয়াত স্বামী সাঈদুর রহমান নিউটনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন।
মিরপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ হিসেবে মিষ্টির রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পদত্যাগ করবেন কি না, অপেক্ষা এখন
রাড্ডা সেন্টার ঘিরে অভিযোগ, তদন্ত এবং দলীয় পর্যায়ের আলোচনার মধ্যে মিষ্টির সংসদ সদস্য পদ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একদিকে কয়েকটি সূত্র বলছে, শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং রোববার স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে দলীয় সূত্রের আরেক অংশ বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়। মিষ্টিও এখন পর্যন্ত নির্দেশ পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি।
ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবেন কি না, তা স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত—দুই দিকেই এখন নজর রয়েছে।
সবার দেশ/এমকেজে




























