‘শাউয়া-মাউয়া-কাউয়া’: প্রতিরোধের রাজনীতি ও ভাষার বিবর্তন
পরিশীলিত কিংবা অশ্রাব্য ‘শব্দ’ ও ‘শব্দগুচ্ছ’ আসলে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি। মানবসভ্যতার ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নিষ্পেষিত মানুষের ইতিহাস মূলত প্রতিরোধেরই ইতিহাস। আর সে প্রতিরোধের জন্য প্রতিবাদের প্রথম ও মৌলিক মাধ্যমটি হচ্ছে ভাষা।
দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবিচারের ভারে মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তার সামনে তখন বিকল্পের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। তার অস্তিত্ব যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তার নীরবতা তখন আর নিরপেক্ষতার প্রতীক থাকে না; বরং তা আত্মসমর্পণের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। এ চরম বাস্তবতায় মানুষ যে অস্ত্রটি শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে বা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তা অনেক সময়ই দৃশ্যমান বা শারীরিক নয়, বরং ভাষাগত প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ।
শব্দ, মুখের বুলি, উচ্চারণ, এমনকি গালিগালাজ বা ‘গাইল’, সবকিছু মিলিয়ে ভাষা তখন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের এক তীব্র ও তাৎপর্যপূর্ণ মাধ্যম। অন্তর্গত বেদনা-বিক্ষোভের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনির মাধ্যমেই জালেমের সাথে মজলুমের এ সংঘর্ষে গড়ে ওঠে এক প্রতিরোধী চেতনা, যেখানে ভাষাই হয়ে দাঁড়ায় মজলুমের শেষ আশ্রয়, শেষ প্রতিরোধ, শেষ আর্তনাদ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সংস্কৃতিক বাস্তবতা এ তাত্ত্বিক সত্যের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। দীর্ঘ সতেরো বছরের বিদ্রুপ-অপবাদ-অপমান, দমন-পীড়ন, গুম, খুন ও অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়নের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষকে কেবল শারীরিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, গভীর মানসিক যন্ত্রণার ভারেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকার তথা শাসকশ্রেণী এবং তার সেবাদাসশ্রেণী জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিলো জাতির বুকের ওপর।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি দমন-শোষন-শাসন একটি ‘সামষ্টিক আতঙ্ক বা ভীতি‘ (কলেক্টিভ ট্রমা) তথা সমষ্টিগত মানসিক অভিঘাতের জন্ম দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা ও ভাবনা-প্রকাশভঙ্গি কিংবা ভাষায়। ফলে এ পরিস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ মানুষের ভাষা আর পরিশীলিত, ভদ্র বা শিষ্ট থাকার সামাজিক দায় বহন করে না। বরং তা ভেঙে ফেলে প্রচলিত শালীনতার শ্রেণীগত কিংবা ভাষাগত প্রকাশভঙ্গির কাঠামো। সাধারণ মানুষ আশ্রয় নেয় এমন এক ভাষার, যাকে আমরা সহজেই ‘অশ্রাব্য’ বা ‘অশালীন’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ অশ্রাব্যতাই কি প্রকৃতপক্ষে অশালীন কিংবা তিরস্কারযোগ্য? নাকি এটি নিপীড়িত মানুষের জমাটবাঁধা ক্ষোভ, দুঃখ ও বেদনার এক অনিবার্য এবং অকৃত্রিম ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ কিংবা হতাশা আশ্রিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ, যা সামাজিক অভিধানে ‘অশালীন’ হলেও ন্যায়বোধের বিচারে এক গভীর বেদনাহত ব্যক্তিসত্তার মানবিক আর্তনাদ?
এ প্রসঙ্গে যুগসন্ধির নকিব শহীদ ওসমান হাদির একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের ভাষার অভিনব ও তীব্র ব্যবহারের কারণে তাকে অভিযুক্ত কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং এখনও করে চলেছে তথাকথিত সুশীলদের কেউ কেউ; যারা মূলত স্বৈরাচারী বন্দোবস্তের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দোসর হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে চিহ্নিত।
কিন্তু জীবিত অবস্থায়ই হাদি তার স্বভাবসুলভ প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিদীপ্ততার সঙ্গে সে সমালোচনার যৌক্তিক জবাব দিয়েছিলেন। তিনি জালিমের বিরুদ্ধে এ গালির ভাষাকে আখ্যা দিয়েছিলেন, ‘মজলুমের মহাকাব্য’ হিসেবে। এ একটিমাত্র বাক্যবন্ধের মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সত্যটি: যে ভাষা সভ্যতার প্রচলিত মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, সেটিই কখনও কখনও হয়ে ওঠে ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী দলিল। কারণ এ ভাষা অলঙ্কৃত নয়, তথাকথিত ‘আধুনিকতা’র মানদন্ডে অকর্ষিত হলেও কৃত্রিম নয়; এটি ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের গভীর থেকে সরাসরি উচ্চারিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চিৎকার এবং এক অর্থে এক ধরনের মহানাদ, যা জালিমের পক্ষে নীরবতার বিরুদ্ধে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সুতীব্র ঘোষণাকেই বহন করে।
ভাষার মৌলিক উপাদান হলো ‘শব্দ‘ বা ‘শব্দগুচ্ছ‘ যা প্রথমত ব্যক্তির মুখ থেকেই উৎসারিত হয়; সে অর্থে তা ব্যক্তিগত। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় আমরা জানি, যখন কোনও শব্দ জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা আর ব্যক্তিগত সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; বরং তা রূপান্তরিত হয় একটি সামষ্টিক, সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক চিহ্নে। এ রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানের (সোসিও-লিঙ্গুইস্টিক) পরিভাষায় বলা যেতে পারে ‘সামষ্টিক অধিগ্রহণ’ (কলেক্টিভ এপ্রোপ্রিয়েশান) যেখানে জনতা কোনও শব্দকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের তথা সুখ-দু:খ, আনন্দ-বেদনা কিংবা বিশ্বাস ও চেতনার বাহক হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে যে শব্দ একসময় ছিলো প্রান্তিক, উপেক্ষিত বা তথাকথিত ‘অচল’ কিংবা ‘অশালীন’, সেটিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সচল, গ্রহণযোগ্য এবং কেন্দ্রীয়।
এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই ভাষা নতুন অর্থ, নতুন শক্তি, নতুন মাত্রা এবং নতুন দিকনির্দেশনা অর্জন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এভাবেই ভাষা যুগের ধর্ম, বর্তমানের প্রয়োজন ও সময়ের চরিত্রকে ধারণ করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোনও কোনও শব্দ বা বাক্যবন্ধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় তীব্র রাজনৈতিক রূপকে; যেমন ‘মীর জাফর’ বিশেষ্যটি বিশেষণ হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশব্দে রূপান্তরিত হয়, কিংবা ‘মগের মুলুক’ বাগধারাটি হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের প্রতীক। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে ভাষা তখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, প্রতিরোধ ও বিচারবোধের ধারক।
প্রবাদ-প্রবচন, রূপক, উপমা- এসবকিছুর মধ্য দিয়েই ভাষা নিজেকে সমৃদ্ধ করে, প্রসারিত করে, এমনকি কখনও কখনও শোধিত ও পরিশীলিত করে। এ সমগ্র প্রক্রিয়াটি প্রায়ই সমাজের অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে এক ধরনের ‘উপজাত’ (বাই-প্রডাক্ট) হিসেবে জন্ম নেয় যা প্রথম দৃষ্টিতে ‘অশালীন’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা ভাষা ও সমাজ উভয়ের জন্যই এক ধরনের ‘শাপে বর’ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামীণ জীবনে বাংলায় এমন ‘অমার্জিত’ (স্ল্যাং) শব্দ, শব্দগুচ্ছ, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা ভুরে ভুরে ব্যবহৃত হয়।
অতএব, যারা আজ বিদ্বেষপ্রসূত উদ্বেগে উৎকণ্ঠিত হয়ে এ প্রজন্মের প্রতিবাদী তরুণদের ব্যবহৃত ভাষাকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় তুলছে, এমনকি তাদেরকে ‘ন্যাংটা’ করে নিরস্ত্র ও নিবৃত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের জন্য ইতিহাসে অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জালেমের পক্ষে কিংবা ইনসাফের বিপক্ষে কৌশলী বয়ান নির্মাণ কখনোই জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ভাষাকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখতে পারে না। বরং প্রতিবারই দেখা গেছে, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ভাষা শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে জনতার অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান আশ্রিত দৈনন্দিন জীবনচর্যানির্ভর মনের গভীর থেকে উঠে আসা ভাষার সামনে।
এ প্রেক্ষাপটে ওসমান হাদির অবস্থান ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের রাজনীতিতে ‘গাইল’-এর ব্যবহারে তার ভাষ্য আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য দৃষ্টান্ত: কৌশলী দুর্বৃত্তায়ণ ও বয়ান-নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা ও ভাষার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় তিনি স্বল্প সময়েই তার একটি দিকনির্দেশনা ও দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
আরও পড়ুন <<>> স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা
আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, ব্যক্তিমানুষের ক্ষোভ যখন দীর্ঘ সময় ধরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে, তখন তা আর ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় জনরোষে। মনোবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষোভের এ রূপান্তর একটি সুপরিচিত প্রক্রিয়া। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা যখন সমষ্টির অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, তখন তা একটি ‘সামষ্টিক চেতনা’-র (কলেক্টিভ কন্সাসনেস) জন্ম দেয়। আর এ জনরোষই একসময় বিস্ফোরিত হয় গণআন্দোলনে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে রূপ নিতে পারে গণবিপ্লবে। ফলে ভাষা, যা প্রথমে ছিলো ব্যক্তির ক্ষোভের বাহন, তা ক্রমে হয়ে ওঠে জনতার ঐক্যবদ্ধ চেতনার প্রতীক, দ্রোহের বহিঃপ্রকাশের মূর্ত রূপ।
বাংলামুলুকে ভাষার বিবর্তন ও রূপান্তরের এ ধারাটি ইতিহাসে মোটেই নতুন নয়। আঠারো শতকের উপনিবেশিক কলকাতায় উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানের প্রেক্ষাপটে কবিয়ালদের ভাষার ব্যবহার তার একটি উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সে কবিয়ালদের ‘খিস্তি খেউর’-এর মাঝে তথা পালাগান, তর্ক ও প্রতিযোগিতামূলক কাব্যের ভাষায় আমরা দেখি ব্যঙ্গ, কটাক্ষ, তীব্র বাক্যবাণ, এমনকি তথাকথিত অশ্রাব্যতারও এক সৃজনশীল ও কৌশলগত ব্যবহার। ভাষা সেখানে নিছক বিনোদনের উপকরণ ছিলো না; বরং তা হয়ে উঠেছিলো সামাজিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের মাধ্যম। আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণের এ ভাষিক পরিসর আসলে ছিলো একটি চলমান শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিফলন, যেখানে ভাষাই ছিলো প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ এবং নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর হাতিয়ার। অর্থাৎ ভাষা তখন সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব, আন্তসম্পর্ক, বিবর্তন ও পরিবর্তনের জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করছিলো।
মূলত ভাষা স্থির কোনও সত্তা নয়; বরং তা প্রবাহমান নদীর মতো। ভাষা সময়, সমাজ ও ইতিহাসের গতির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত বিবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়। ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, ভাষা একটি জীবন্ত অর্গানিজমের মতো যা জন্ম নেয়, বিকশিত হয়, কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, আবার কখনওবা নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে। সমাজে যখন অবক্ষয়, নৈরাজ্য, বৈষম্য বা সংকট দেখা দেয়, তখন তার প্রতিফলন অনিবার্যভাবে ভাষাতেও প্রতিফলিত হয়। যে ভাষা আর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারে না, তা ক্রমে ভেঙে পড়ে। তার জায়গা দখল করে নেয় এমন এক নতুন ভাষা, যা সময়ের সত্য, মানুষের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান কিংবা সামষ্টিক স্মৃতি ও সামাজিক টানাপোড়েনকে ধারণ করতে সক্ষম।
এ ভাঙন ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই ভাষা নিজেকে নতুন করে বিনির্মাণ করে। একে আমরা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখতে পারি যেখানে পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন অর্থ ও প্রকাশভঙ্গির জন্ম হয়। আর এ পরিবর্তন কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং সমাজের গভীরে চলমান রূপান্তরেরই ধারাবাহিকতা। ফলে ভাষার এ ভাঙা-গড়া, গঠন-পুনর্গঠন ও নবায়নকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভাষা যেহেতু কখনওই বস্তু নিরপেক্ষ নয়, তাই এটিকে বুঝে ওঠা, বিশ্লেষণ করা এবং সময়োপযোগীভাবে গ্রহণ করাই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব এবং অগ্রগতি স্মারক।
গণঅভ্যুত্থান বা তীব্র সামাজিক অস্থিরতার সময় ভাষার এ রূপান্তর আরও দ্রুত, ঘনীভূত এবং তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। তখন ভাষা আর কেবল যোগাযোগের নিরপেক্ষ মাধ্যম থাকে না; এটি রূপ নেয় প্রতিরোধের অস্ত্রে, প্রতিবাদের স্লোগানে, আর কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রতিশোধের প্রতীকে। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনেই আমরা এ বাস্তবতার প্রতিফলন দেখি যেখানে ভাষা জনতার আবেগ, ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষাকে সংগঠিত করে এক ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ফলে এ রূপান্তরকে অস্বীকার করার কোনও অবকাশ নেই; বরং চলমান পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে ধারণ করে ভাষার এ বিবর্তন সামাজিক রূপান্তরের এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান।
স্বাভাবিকভাবেই, যারা পুরোতন বন্দোবস্তে অভ্যস্ত এবং সেটিকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর, বর্তমানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের কাছে নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী ভাষা অসহনীয় মনে হয়। কারণ এ ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও আক্রমণের ভাষা কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। তাই স্বৈরাচারী বন্দোবস্তের কিংবা বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুবিধাভোগী তথাকথিত সুশীলেরা শালীনতা, শিষ্টাচার বা নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে এনে কৌশলে ভাষার এ ব্যবহারকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে যেনো ভাষার তথাকথিত ‘অশালীনতা’কে কেন্দ্র করে মূল অন্যায় ও অবিচারের প্রশ্নটি আড়াল করা যায়।
এটি আসলে একটি সুপরিচিত কৌশল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান তৈরির রাজনীতি, যেখানে প্র্রতিপক্ষের ভাষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভাষাগত ও কালচারাল হেজিমনির বিস্তারে মাধ্যমে বাস্তবতাকেই নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস চালানো হয়। তা সত্ত্বেও লক্ষ্যণীয় যে, নতুন প্রজন্ম অভিনব ও সৃজনশীল কলাকৌশলের মাধ্যমে এ বয়ান তৈরির দুর্ভিসন্ধি ও অপপ্রয়াসগুলোকে প্রতিনিয়তই চ্যালেঞ্জ করছে।
যদিও ভাষার ব্যবহারের মাধ্যমে কালচারাল হেজিমনি বজায় রাখার বিরুদ্ধে এ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধ এখনও পুরোপুরি সুচিন্তিত বা সুসংগঠিত কোনো কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়, তবুও এর ভেতরে একটি স্বতঃস্ফূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি কাজ করছে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সত্যিকার অর্থেই রাজনৈতিক প্রতিরোধে ভাষার ব্যবহারে শহীদ ওসমান হাদীর অবস্থান, কৌশল ও ব্যাখ্যা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গণমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিআক্রমনের তথাকথিত ‘কুরুচিপূর্ণ’ ভাষা ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তিনি বিষয়টি অত্যন্ত স্বচ্ছ, যৌক্তিক ও সুসংহতভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, এ ভাষারও একটি নির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে, এবং এর ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে প্রেক্ষাপটনির্ভর। এমনকি ‘অশালীন’ ভাষার ব্যবহারকে তিনি এক ধরনের একাডেমিক সমালোচনার আলোকে যৌক্তিক ভিত্তিসম্পন্ন ভাষাচর্চা হিসেবেও চিহ্নিত করেন যা সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের আলোকে আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যা এই লেখার পরিধির মধ্যে পড়ে না।
সে যাই হোক, শহীদ ওসমান হাদির বক্তব্য ছিলো দৃঢ়, আত্মপ্রত্যয়ী ও স্পষ্ট। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে আরও বলেছেন, সমাজে প্রচলিত শালিনতার মানদন্ডে এ ‘অশালীন’ ভাষা সবসময় সবার জন্য সব জায়গায় ব্যবহারের করা যাবে না; বরং এটি শক্তিমানের বিপক্ষে এক ধরনের ‘সংরক্ষিত অস্ত্র’, যা প্রয়োজনের মুহূর্তে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি ও তাদের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে, এবং প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তা ভবিষ্যতে সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। অর্থাৎ এ ভাষাকে কেবল আবেগের তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক অবস্থানও হতে পারে যেখানে শব্দের নির্বাচন, উচ্চারণের ও ব্যবহারের তীব্রতা এবং প্রকাশের ধরন সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নির্ধারিত হয়।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিরোধের রাজনীতিতে ভাষা হয়ে ওঠে ন্যায্যতার তথা ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের পথে একটি কার্যকর নৈতিক উপকরণ। তবে তথাকথিত ‘কদর্য’ ভাষার কার্যকারিতা নির্ভর করে এর সঠিক ও সংযত ব্যবহারের ওপর। কারণ যে অস্ত্র যত শক্তিশালী, তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত বেশি। তাই প্রয়োজন প্রজ্ঞা, প্রেক্ষিতবোধ এবং নৈতিক সংযম যাতে ভাষা ধ্বংস বা বিশৃঙ্খলা নয়, বরং ন্যায় ও মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। প্রাসঙ্গিকভাবেই এখানে বহুলপ্রচলিত একটি আপ্তবাক্য নতুন অর্থ ও তাৎপর্য লাভ করে, বাস্তবে আমরা দেখতে পাই, ‘মানুষ দুঃখ পেলে খোদাকেও গালাগালি করে’। প্রথম দৃষ্টিতে এটি নিছক হতাশা বা বেদনার প্রকাশ মনে হলেও, গভীরভাবে দেখলে এটি মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণার এক তীব্র ভাষ্য ও কঠিন জীবনবাস্তবতা, যা একই সঙ্গে প্রতিবাদী কণ্ঠের বৈধতাকেও প্রতিষ্ঠা করে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখন মানুষ চরম অসহায়তার মুখোমুখি হয় এবং তার চারপাশের সব প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়, বিশেষ করে রাষ্ট্র, সমাজ, ন্যায়বিচার প্রভৃতি ব্যর্থ হয়ে পড়ে, তখন সে ভাষার মধ্য দিয়েই তার অস্তিত্বের শেষ দাবি উত্থাপন করে। এ ভাষা তখন আর কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী ঘোষণা, ‘যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, ততক্ষণ আমি আর অন্যায়কে মেনে নিচ্ছি না’। ফলে সে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধ অভীপ্সা শালীন না অশালীন এ প্রশ্নটি গৌণ হয়ে পড়ে; মুখ্য হয়ে ওঠে ন্যায়ের পক্ষে ন্যায্যতার দাবি ও অন্যায়ের প্রতিরোধ।
এ কারণেই গণঅভ্যুত্থানকালিন সময়ে ব্যবহৃত ‘শাউয়া-মাউয়া-কাউয়া’ ধরনের শব্দ বা শব্দগুচ্ছ অর্থাৎ নানা ‘গাইল’-কে কেবল অশ্রাব্যতার খোপে ফেলে খারিজ করে দিলে আমরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের ভাষার গভীরতর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করি। এ ভাষা নিছক আবেগের উচ্ছ্বাস নয়; এটি আমাদের সময়ের এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক দলিল। এখানে জমা থাকে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের কিংবা প্রতিহত করার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা; একই সঙ্গে এতে প্রতিফলিত হয় মানুষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রয়াস। অর্থাৎ এই ‘গালাগালি’-র ভাষা শুধু প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের নয়, প্রতিহত করা ও অর্জনেরও সহায়ক অস্ত্র। কারণ এটি নীরবতা ভাঙার ভাষা, আত্মপ্রকাশের ভাষা, আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে রুখে দাঁড়ানোর ভাষা।
ভাষার এ বিবর্তনকে বুঝতে হলে কেবল শব্দের শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতার বিচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ভাষার পেছনে যে ইতিহাস, যে সামাজিক বাস্তবতা, যে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কষ্ট-যন্ত্রণা-ভয়ের তীব্রতা এবং দ্রোহের আগুন কাজ করে তা অনুধাবন করাই এখানে মুখ্য। সমাজতাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে ‘সামষ্টিক স্মৃতি’ (কালেক্টিভ মেমোরি) বলা হয়, এখানে এ ভাষা তারই অন্যতম বাহক। এ স্মৃতির ভেতর দিয়ে একটি সমাজ তার অতীতের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান, বর্তমানের সংগ্রাম ও অর্জন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। ফলে ভাষার এ রূপান্তরকে অস্বীকার করা মানে কেবল শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে অস্বীকার করা নয়; বরং একটি জাতির মানুষের যাপীত জীবনের অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান, আনন্দ-বেদনা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ধারাবাহিকতায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।
পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক মানদন্ডে ভাষা কেবল ভদ্রতার আবরণ বা ভাবপ্রকাশের নিরপেক্ষ বাহন নয়; এটি সমাজের অন্তর্গত সত্যের এক জীবন্ত প্রতিফলন এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও বিনির্মাণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। যখন সমাজে অবিচার স্ফীত হয়, দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয় এবং অভিঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন ভাষাও তার স্বর, ভঙ্গি ও রূপ পরিবর্তন করে যা ভাষার স্বাভাবিক, অবশ্যম্ভাবী চলমান গতিপথের নির্দেশক। ভাষার এ পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরকে দমন বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আসলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করারই নামান্তর। জাতীয় উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির স্বার্থে প্রয়োজন তা গভীরভাবে বোঝা, বিচার-বিশ্লেষণ করা এবং পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী মূল্যায়ন করা। প্রয়োজন গণবিতর্কের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জ্ঞানীয় উৎকর্ষের আলোকায়ন ও বয়ান তৈরির রাজনৈতিক অপকৌশলের মূল উৎপাটন। কারণ ভাষার এ রূপান্তরের ভেতরেই নিহিত থাকে জাতির অনাগত সময়ের পূর্বাভাস এবং ভবিষ্যতে অগ্রগতির রাজপথ নির্ধারণের দিকনির্দেশনা। আর ভাষার এ বিবর্তন ধারণ করে রাষ্ট্র কিংবা সমাজের দ্বান্দ্বিক অবস্থা, যা হয়তো চলমান সময়ে ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে পুনর্গঠনের সম্ভাবনার দিকেও বয়ে নিয়ে চলেছে। তাই এ পরিবর্তনকে ভয় নয়, বরং আমাদের বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধি দিয়ে তাকে গ্রহণ করতে হবে; হৃদয়ের উষ্ণতায় তাকে অনুধাবন করতে হবে; এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থাশীল থেকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণমুখী এক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে তাকে আলিঙ্গন করতে হবে।
লেখক:
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য




























